কোথাও করিডোর হয়েছে সংকুচিত, কোথাও পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। ফলে খাবার ও পানির সন্ধানে হাতির পাল ঢুকে পড়ছে মানুষের বসতিতে।

দেশের ১২টি প্রধান হাতি করিডোরের আটটিই চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে। এ অঞ্চলের হাতিদের একটি অংশ সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারের বনাঞ্চলেও চলাচল করে। ফলে এশীয় হাতির জন্য দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল ও চলাচলের পথগুলোর একটি এ অঞ্চল। কিন্তু সমুদ্র, পাহাড় ও আন্তর্জাতিক সীমান্তের মাঝখানে থাকা সরু ভূখণ্ডটিতে মানুষের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যত বিস্তৃত হচ্ছে, বন্য এ প্রাণীর জন্য নিরাপদ জায়গা ততই কমে আসছে।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন, ২০১২-এ হাতি হত্যা, শিকার এবং দেহের অংশ অবৈধভাবে সংগ্রহ ও বাণিজ্যের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে। এসব আইন ও নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ হলেও হাতি সংরক্ষণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তার থাকার জায়গা ও চলাচলের পথটুকু অক্ষত রাখা।

বাংলাদেশের হাতি সংরক্ষণ কর্মপরিকল্পনায়ও বনভূমি দখল, কৃষি সম্প্রসারণ, বসতি ও অবকাঠামো নির্মাণের কারণে আবাসস্থল খণ্ডিত হওয়াকে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শিকার ও অবৈধ বাণিজ্য ঠেকাতে গোয়েন্দা ব্যবস্থা, নিয়মিত পাহারা ও অভিযান জোরদার এবং হাতি হত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া শক্তিশালী করারও সুপারিশ রয়েছে।

চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত অঞ্চলটির ভৌগোলিক বাস্তবতা হাতির জন্য এমনিতেই সংকটপূর্ণ। একদিকে বঙ্গোপসাগর, অন্যদিকে পাহাড় ও সীমান্ত। হাতির সামনে বিকল্প স্থলপথও খুব বেশি নেই। অথচ এ সরু ভূখণ্ডেই গত কয়েক দশকে একের পর এক বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্প-কারখানা, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক সম্প্রসারণ—সব মিলিয়ে এ অঞ্চলের ভূমি ব্যবহারে বড় পরিবর্তন এসেছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, পৃথক একটি প্রকল্প হয়তো তার নিজস্ব পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করে বাস্তবায়ন হয়। কিন্তু একের পর এক প্রকল্প যখন একই ভূখণ্ডে গড়ে ওঠে, তখন সেগুলোর সম্মিলিত প্রভাব পড়ে হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের ওপর। করিডোরের একাংশ বন্ধ হয়ে গেলে হাতি বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হয়। আর সে বিকল্প পথ প্রায়ই হয়ে ওঠে মানুষের বসতি, কৃষিজমি কিংবা সড়ক-রেলপথ।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, হাতির করিডোরে বসতি, সংরক্ষিত বনের মধ্য দিয়ে সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ বুনোহাতি সংরক্ষণের বড় সংকট। খাবার, পানি ও আশ্রয়ের সন্ধানে নির্দিষ্ট পথ ধরে চলা হাতির সে পথে বাধা তৈরি হলে এরা বিকল্প পথ বেছে নেয়। আর সে বিকল্প পথ প্রায়ই মানুষের বসতি কিংবা কৃষিজমির মধ্য দিয়ে যায়। ফলে যে হাতি কয়েক দশক আগেও বনের ভেতর দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচল করত, এখন সেটিই মানুষের চোখে ‘উপদ্রব’ হয়ে উঠছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ডিএফও রফিকুজ্জামান শাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাতি নির্দিষ্ট করিডোর দিয়ে চলাচল করে। হাতিকে উত্ত্যক্ত করা যাবে না এবং তার চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টি বা খাদ্যাভ্যাস নষ্ট করা যাবে না। এজন্য হাতি অধ্যুষিত এলাকায় দল গঠন এবং স্থানীয় মানুষকে সচেতন করতে প্রচার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তাও দেয়া হচ্ছে।’

হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে বন বিভাগ কাজ করছে বলে জানান পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের ডিএফও এসএম সাজ্জাদ হোসেনও। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন এলাকায় তিনটি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। হাতির খাদ্যের জন্য পাঁচ হেক্টর জমিতে করা হয়েছে বাঁশবাগান।’

বর্তমানে দেশে কতসংখ্যক হাতি রয়েছে তার সঠিক তথ্য নেই। সাম্প্রতিক সময়ে এ নিয়ে তেমন জরিপও হয়নি। ২০১৮ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে এশীয় হাতির সংখ্যা ২১০-৩৩০-এর মধ্যে। এর প্রায় ৩০ শতাংশ আন্তঃসীমান্ত চলাচল করে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে চলাচল করা এসব হাতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই করিডোর ব্যবহার করছে। কিন্তু সীমান্তের বেড়া, বসতি, বন উজাড় ও বিভিন্ন অবকাঠামো তাদের সেই চলাচলে বাধা তৈরি করছে। অর্থাৎ হাতির জন্য সংকট শুধু বাংলাদেশে নয়, আন্তঃসীমান্ত চলাচলের পথও ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের সময় হাতি চলাচলের করিডোর নিয়ে উদ্বেগ ছিল। হাতি সংরক্ষণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দুটি করিডোর রাখার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত একটি করিডোর করা হয়। রেলপথ নির্মাণে নিধন হওয়া গাছের ক্ষতিপূরণ ও বনায়নের জন্য প্রায় সাত লাখ গাছ লাগানোর কথা ছিল। রেলওয়ে গাছ লাগানোর ঘোষণা দিলেও পরিচর্যার অভাবে অধিকাংশ গাছ মারা গেছে বলে বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ফলে শুধু করিডোর নয়, হাতির খাদ্যের উৎসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নির্মিত করিডোর বা ওভারপাস দিয়ে কাঙ্ক্ষিতসংখ্যক হাতি চলাচল না করে রেললাইনে উঠে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। রেলপথ উদ্বোধনের পর হাতির পালকে ট্রেন ধাক্কা দেয়ায় হাতিমৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাতি চলাচলের পথ সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে অবকাঠামো নির্মাণ ও মানুষের বসতি সুরক্ষার বিষয়টিই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। এর পরও চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বাধাগ্রস্ত বা বিচ্ছিন্ন গুরুত্বপূর্ণ করিডোর পুনরুদ্ধারসহ হাতি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেয়া জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়ন কিংবা সড়ক অবকাঠামো নির্মাণের সময় বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। বন বিভাগ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি সচেতন ও কঠোর অবস্থানে রয়েছে।’

কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার পাহাড়ি অঞ্চল হাতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। ২০১৭ সালে নতুন করে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের পর এ অঞ্চলের বন ও পাহাড়ের ওপর চাপ বেড়ে যায়। প্রায় ১০ লাখ মানুষের বসতি স্থাপনের জন্য পাহাড় কাটা ও বন ধ্বংসের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জীববৈচিত্র্য। হাতি চলাচলের পথ সংকুচিত হয়, কমে যায় খাদ্যের উৎস।

এর আগে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কোরিয়ান ইপিজেড স্থাপনের কারণেও হাতি খাদ্যের অনেক উৎস হারিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। বনের ভেতর খাবার কমে গেলে হাতির সামনে তখন লোকালয়ে যাওয়াই সহজ পথ। কৃষকের ধানখেত, ফলের বাগান কিংবা বসতবাড়ির খাদ্যই হয়ে ওঠে তাদের বেঁচে থাকার উপকরণ।

পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, একদিকে সমুদ্র, অন্যদিকে পাহাড় ও আন্তর্জাতিক সীমান্ত—এ সরু ভূখণ্ডে অবকাঠামোর চাপ বাড়তে থাকলে এশীয় হাতির জন্য নিরাপদ আবাসস্থল ও চলাচলের পথ আরো সংকুচিত হবে। তারা বলছেন, হাতি লোকালয়ে ঢোকার পর তাকে তাড়ানো যায়। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেটি প্রয়োজনও। কিন্তু হাতি কেন লোকালয়ে ঢুকছে, সে প্রশ্নের উত্তর না খুঁজলে সংঘাত বারবার ফিরে আসবে।

হাতির আক্রমণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বন বিভাগের প্রকল্প থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। কেউ মারা গেলে ৩ লাখ টাকা, আহত হলে ১ লাখ এবং ফসল ও সম্পদের ক্ষতি হলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা দেয়া হয়। কিন্তু যে বন হারিয়ে গেছে, যে করিডোর বন্ধ হয়ে গেছে, সেটি ফিরিয়ে দেয় না কোনো কর্তৃপক্ষই।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলের বাস্তবতা আরো কঠিন। এ অঞ্চল ঘিরে নতুন বন্দর, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল, রেলপথ ও সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সামনে। ফলে ভবিষ্যতে ভূমির ওপর চাপ কমার সম্ভাবনা নেই। এ বাস্তবতায় শুধু পৃথক প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করলেই হবে না; পুরো অঞ্চলের ওপর প্রকল্পগুলোর সম্মিলিত প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। কোন করিডোর কোথায়, কোন পথে হাতির পাল যায়, কোথায় তাদের খাদ্য ও পানির উৎস—এসব তথ্যকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় অংশ করা জরুরি।