দেশে কয়েক বছর ধরেই অক্টোবর-নভেম্বরে পেঁয়াজের বাজারদর বাড়তে দেখা যাচ্ছে। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসার পর এ দাম কিছুটা কমতে শুরু করে। তবে এবার ভারি বৃষ্টিপাতের পর আগেভাগে কুয়াশা পড়ায় মুড়িকাটা পেঁয়াজের উৎপাদন নিয়েও তৈরি হয়েছে আশঙ্কা।

কৃষকরা বলছেন, এবার মৌসুমের শুরুতে ভারি বৃষ্টিপাতের প্রভাবে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ চার-পাঁচ সপ্তাহ পিছিয়ে গেছে। এর মধ্যেই নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে কুয়াশা নিয়ে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ঘন কুয়াশা পড়লে চারা স্বাভাবিক গতিতে বেড়ে উঠতে পারে না, ফলনও কমে যায়।

কৃষকরা বলছেন, আবাদ পিছিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তাদের উৎপাদন খরচও এবার বেড়ে গেছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, বৃষ্টির পানিতে অনেক বীজ নষ্ট হয়েছে। এছাড়া বীজ, সার ও কীটনাশকের দামও এবার চড়া।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, দেশে দুই পর্যায়ে দুই রকমের পেঁয়াজ আবাদ হয়। একটি হলো আগাম বা মুড়িকাটা পেঁয়াজ, যেটি সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু করে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত রোপন করা হয়। অন্যটি হলো চারা পেঁয়াজ, যেটির রোপন চলে নভেম্বর থেকে শুরু করে জানুয়ারি পর্যন্ত। মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসতে সময় লাগে আড়াই-তিন মাস। অন্যান্য বছর ডিসেম্বরে এ পেঁয়াজ বাজারে উঠতে শুরু করে। কিন্তু এবার জানুয়ারির আগে সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা।

দেশে সবচেয়ে বেশি মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষ হয় কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, রাজশাহী ও পাবনায়।

বিভিন্ন জেলার কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এসব জেলায় দেশের মোট উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় অর্ধেক আবাদ হয়। এর মধ্যে শীর্ষ আট জেলায় এবার ৫৫ হাজার হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। বিপরীতে চাষ হচ্ছে ৪২ হাজার ১৯৮ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে কুষ্টিয়ায় ৩ হাজার ৬০০ হেক্টর, মাগুরায় ১০ হাজার, ফরিদপুরে ৫ হাজার ৫৮৮, ঝিনাইদহে ৬ হাজার ৮০০, রাজবাড়ীতে ৫ হাজার ৪৫০, পাবনায় ২ হাজার ৮০০ ও রাজশাহীতে ৭ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে।

রাজবাড়ীর কৃষকরা জানান, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে দফায় দফায় বৃষ্টির কারণে জেলায় মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদ অন্তত এক মাস পিছিয়ে গেছে। এর মধ্যে কুয়াশার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজবাড়ীতে এ বছর ৩৬ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যার মধ্যে মুড়িকাটা রয়েছে ৫ হাজার হেক্টর।

রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলার হরিণবাড়িয়ার কৃষক আয়নাল ফকির বলেন, ‘সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এক বিঘা জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ রোপণ করেছিলাম। কিন্তু বৃষ্টির কারণে খেতে পানি জমে বীজ পচে গেছে। তাই এখন আবার নতুন করে রোপণ করতে হচ্ছে।’

জেলার খানগঞ্জ ইউনিয়নের কৃষক আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর বৃষ্টিতে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। এখন আবার কুয়াশা পড়া শুরু হয়েছে। কুয়াশার কারণে পেঁয়াজ উৎপাদন ব্যাহত হবে। কারণ ঘন কুয়াশা পড়লে পেঁয়াজ গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। আর গাছ বড় না হলে পেঁয়াজও বড় হবে না।’

কৃষক আরব আলী বলেন, ‘এ বছর পেঁয়াজের বীজ, সার, কীটনাশক সবকিছুরই দাম বেশি। এ কারণে উৎপাদনে খরচও পড়বে বেশি।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজবাড়ীর অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) হোসেন শহীদ সরোওয়ার্দী বলেন, ‘রাজবাড়ীতে সারা দেশের ১৪ শতাংশ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়।’

বণিক বার্তার ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, বৃষ্টির কারণে এ জেলায় মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ অন্তত তিন সপ্তাহ পিছিয়ে গেছে। আবার এ বছর আগেই কুয়াশা পড়তে শুরু করায় নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এছাড়া গত বছর যে বীজের প্রতি মণের দাম ছিল ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা, এবার তা দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান মনে করেন এখন পর্যন্ত যে পরিমাণে কুয়াশা পড়ছে, তাতে পেঁয়াজের ক্ষতি হবে না; তবে গাছ বড় হওয়ার পর কুয়াশা পড়লে ক্ষতি হতে পারে।

তিনি জানান, এ বছর জেলার নয়টি উপজেলায় ৪৩ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে হালি ও মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

পাবনা প্রতিনিধি জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় ৮ হাজার ৫৮০ হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ২২ হাজার ৫৯৬ টন। এ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে।

জেলার সুজানগর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রত্না খাতুন বলেন, ‘বর্তমানে যে কুয়াশা পড়ছে, তাতে পেঁয়াজের ক্ষতির আশঙ্ক নেই। তবে ভারী কুয়াশা হলে ফসলে ছত্রাক দেখা দিতে পারে।’

কৃষকদের বরাত দিয়ে কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, এবার বৃষ্টির কারণে জমিতে পানি জমে থাকায় দুই-তিন সপ্তাহ দেরিতে পেঁয়াজ রোপণ করতে হয়েছে। অঙ্কুরোদগমের আগেই পচে যাচ্ছে অনেক জেলার নিচু জমির বীজ। ফলে এবার উৎপাদন কিছুটা কম হবে।

সুজানগরের পেঁয়াজ চাষী মোখলেছুর রহমান জানান, অতিবৃষ্টির কারণে জমি থেকে পানি নামতে দেরি হয়েছে। দেরিতে বুনলে গাছের ফুল বেশি হয়, কিন্তু ফলন কম হয়। আবার বাজারে উঠতেও দেরি হবে। ফলে ভালো দাম পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে।