পুলিশ বাহিনীর ভেতরে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সর্বশেষ দুই মাসে ২৭ পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যকে জেলে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীকে শক্তিশালী করতে হলে আগে নিজেদের ঘর পরিষ্কার করতে হবে। একইসঙ্গে যানবাহনের সংকট দূর করতে প্রায় ৫ হাজার ৮০০ গাড়ি কেনার প্রকল্প নেয়া হয়েছে। জনবলের ঘাটতি পূরণে প্রতি বছর ন্যূনতম ১৫ হাজার নতুন পুলিশ নিয়োগ দেয়া হবে।
বাগেরহাট জেলা পুলিশ লাইনস মিলনায়তনে আজ সকালে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশ ও এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
আইজিপি বলেন, ‘গত দুই মাসে আমি ২৭ জন পুলিশ অফিসারকে, পুলিশ সদস্যকে জেলে পাঠিয়েছি এই মাদকের কারণে। আপনারা আর কী চান? আগে ঘর পরিষ্কার হোক, তারপর আপনারা পরিষ্কার হবেন।’
পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, মাদক নির্মূল, জনবল ও যানবাহনের সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আইজিপি বলেন, পুলিশ বাহিনীকে অকার্যকর করে দেয়া হয়েছিল। যারা বাহিনীকে দুর্বল করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
পুলিশের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে কাউকে কক্সবাজারে পাঠানো হলে তিনি নিজেই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন না। ভালো কাজ করলে চাকরি হারানোর ভয় থাকার কথা নয়। এ বিষয়ে দায়িত্ব নেয়ার কথাও জানান তিনি। পুলিশ বাহিনীকে শক্তিশালী করতে নতুন প্রকল্প দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে মানবিক ও বন্ধুসুলভ পুলিশ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান আইজিপি। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিক, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং জনগণের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
বাহিনীর বিদ্যমান সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করে আইজিপি বলেন, জনবলের ঘাটতি একসঙ্গে পূরণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রতি বছর ন্যূনতম ১৫ হাজার নতুন সদস্য নিয়োগ দেয়া হবে। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে জনবলের সংকট কাটিয়ে পুলিশের লজিস্টিক সহায়তা আরো শক্তিশালী করা হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে মাদক, কিশোর গ্যাং, দুর্নীতি ও বিভিন্ন ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বানও জানান আইজিপি।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। একইসঙ্গে বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা। প্রতি বছর প্রায় ২৫-৩০ লাখ শিক্ষিত বেকার এই জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। বেকারত্ব মোকাবেলা, তরুণদের পুনর্বাসন এবং মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে সবাইকে কাজ করতে হবে।
আইজিপি বলেন, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে অপরাধ দমন, সামাজিক সমস্যা সমাধান এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদক, কিশোর গ্যাং, দুর্নীতি ও সম্পত্তিসংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধে এ ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করা হবে। কিশোর গ্যাং নির্মূলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ কার্যক্রম ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করা হবে।
অনেক সময় পুলিশের চেয়েও স্থানীয় মানুষের কাছে অপরাধের তথ্য বেশি থাকে উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, ‘ইউনিয়নের কোন পাড়ায় কে মাদক সেবন করে, কারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত কিংবা কোথায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হচ্ছে—এসব তথ্য স্থানীয় মানুষ অনেক সময় পুলিশের চেয়েও ভালো জানেন। তাই আপনারা পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবেন।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন আইজিপি।
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস করা যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করতে চায়, তাদের সঙ্গে আঁতাতকারীরা দেশপ্রেমিক হতে পারে না।
সবশেষে জনগণের সহযোগিতা কামনা করে আইজিপি বলেন, পুলিশকে শক্তিশালী করতে না পারলে কেউই দিন-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারবেন না। জনগণের সার্বিক সহযোগিতা পেলে বাংলাদেশ পুলিশ একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মো. জামিলুর ইসলামের সভাপতিত্বে সমাবেশে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল করিম, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন, সরকারি পিসি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর পারভীন আক্তার, বাগেরহাট প্রেসক্লাব সভাপতি আবু সাইদ শুনুসহ জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।















