পদ্মার ভাঙনে আশ্রয় হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছেন ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নের কবিরপুর চরের আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা। একই চিত্র মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলায়ও। দুই উপজেলায় নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়েছে ছয় শতাধিক পরিবার। ঘরবাড়ি ও জমিজমা হারিয়ে খাদ্য, নিরাপদ পানি, বাসস্থান ও জীবিকার সংকটে পড়েছে কয়েক হাজার মানুষ।
স্থানীয়দের হিসাবে, ফরিদপুর সদর উপজেলায় অন্তত ৩৫০টি পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। এর মধ্যে কবিরপুরেই ভিটেমাটি হারিয়েছে প্রায় ৩০০ পরিবার। অন্যদিকে হরিরামপুর উপজেলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, নদীতে বিলীন হয়েছে উপজেলার তিন ইউনিয়নের তিন শতাধিক বাড়িঘর। সরজমিনে দেখা যায়, নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে দিশেহারা হয়ে ঘুরছে মানুষ। কেউ ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে, কেউ সর্বস্ব হারিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের বসতি ছেড়ে কোথায় থাকবে, কীভাবে সংসার চালাবে—এমন অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।
ফরিদপুর জেলায় কবিরপুরের আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রায় ১৭০টি পরিবারও পড়েছে চরম সংকটে। এ প্রকল্পের বাসিন্দা জামেলা খাতুনের (৬০) কাছে সরকারি ঘরটি ছিল নতুন করে বেঁচে থাকার অবলম্বন। নদীভাঙনে সেই আশ্রয় হারিয়ে আবারো নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন তিনি। ঘর হারানোর পর প্রয়োজনীয় সহায়তা পাননি বলে জানান জামেলা। তার মতো প্রকল্পের অনেক বাসিন্দাকেই এখন নতুন আশ্রয়ের সন্ধান করতে হচ্ছে।

কবিরপুরের নিঃসন্তান দম্পতি মো. এরশাদ ও হাফেজা খাতুনও হারিয়েছেন দীর্ঘদিনের বসতভিটা। বাধ্য হয়ে কবিরপুর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে ফরিদপুর শহরে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তারা। এ দম্পতির ভাষ্য, নিজেদের বাড়িঘর হারিয়ে এখন অন্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সরকারি বা বেসরকারি কোনো সহায়তাও পাননি তারা। তাদের মতো অনেক পরিবারেরই স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে ভূমিহীন পরিবারগুলোর জন্য নতুন করে জমি ও ঘরের ব্যবস্থা করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে মানিকগঞ্জের হরিরামপুরেও নদীভাঙনে তিন শতাধিক বাড়িঘর বিলীন হয়েছে। এসব পরিবারের অনেকের বসতভিটা ও ফসলি জমিই ছিল জীবিকার প্রধান অবলম্বন। সেগুলো হারিয়ে আশ্রয়ের পাশাপাশি আয়-রোজগার নিয়েও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।
হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আপাতত উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের শুকনা খাবার দেয়া হয়েছে। আর্থিক সহায়তার বিষয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা বা বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। নির্দেশনা পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সারা বছরই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’

ভাঙনকবলিত এলাকায় ঘরবাড়ি হারানোর পাশাপাশি নিরাপদ পানির সংকটও তীব্র হচ্ছে। বসতি ও পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পান করা, রান্না ও দৈনন্দিন কাজে প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে। নদীভাঙনকবলিত এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির হিসাব ও মানুষের প্রয়োজন নিরূপণে কাজ করছেন উৎস সোশ্যাল অর্গানাইজেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা। সংগঠনটির উপদেষ্টা দিদারুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছে। সেখানে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকে নদীর পানি পান করছেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’ দ্রুত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর নারী ও শিশুরাও নানা দুর্ভোগে পড়েছে। নিরাপদ আশ্রয়, খাবার, পানি ও স্যানিটেশন সংকটের পাশাপাশি শিশুদের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গবাদিপশুর খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবারের কাছে এসব পশু জীবিকা নির্বাহের অন্যতম অবলম্বন। সেগুলো হারালে আর্থিক সংকট আরো বাড়তে পারে।
নদীভাঙনে বসতবাড়ির পাশাপাশি যোগাযোগ অবকাঠামো ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও হুমকির মুখে পড়েছে। তীব্র ভাঙনে প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কবিরপুরের একটি সেতু নদীতে বিলীন হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে এলাকার একমাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দ্রুত প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়া না হলে বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আরো ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
তাদের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ ও তীরের স্থিতিশীলতায় পরিবর্তন ঘটছে, যা ভাঙনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। নর্থ চ্যানেল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সরোয়ার হোসেন (সরো মৃধা) বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অবৈধ বালি উত্তোলন বন্ধ এবং স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা না হলে দুই উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ ঝুঁকিতে পড়বে। এরই মধ্যে কয়েকশ বিঘা জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে আরো কয়েক হাজার পরিবার বসতবাড়ি হারাতে পারে।’
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নদীভাঙনের বিষয়টি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। ফিজিবিলিটি স্টাডির জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। ভাঙন প্রতিরোধ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের বিষয়ে ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সোহরাব হোসেন বলেন, বিষয়গুলো নিয়ে কাজ চলছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পাওয়া গেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।’










