দুয়েকজন যারা আসছেন তাদের বেশির ভাগই বই উল্টেপাল্টে দরদাম করে রেখে দিচ্ছেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে পুরনো বইয়ের বাজার একেবারে মুখ থুবড়ে পড়েছে কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ফুটপাত ও অনলাইনে পুরনো বইয়ের এক নতুন বাজার সৃষ্টি হয়েছে।
সরজমিনে দেখা যায়, এ দোকানগুলোর বইয়ের সংগ্রহ বেশ সমৃদ্ধ। এখানে পশ্চিমের বিখ্যাত সব প্রকাশনী যেমন পেঙ্গুইন, ম্যাকগ্রা হিল, ওয়ার্ডসওয়ার্থ ক্লাসিক, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, এলেন অ্যান্ড আনউইন বুকসের পাশাপাশি ভারতের নাভানা, সিগনেট প্রেস, মিত্র এবং ঘোষ, আনন্দ পাবলিশার্সের মতো বিখ্যাত প্রকাশনীগুলোর বিভিন্ন বইয়ের মূল সংস্করণও পাওয়া যায়। এছাড়া বিশ্বের বিখ্যাত সব জার্নাল ও রিভিউয়েরও দেখা মেলে।
নীলক্ষেতের ফুটপাতে ৩৫ বছর ধরে ব্যবসা করছেন পুরনো বই বিক্রেতা শাহাবুদ্দিন। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়; চিকিৎসক, গবেষক, কর্মজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে সচিব, বিচারকরাও তার ক্রেতা বলে জানান তিনি। এর কারণ হিসেবে তার দোকানের দুর্লভ, দুষ্প্রাপ্য ও মৌলিক বইয়ের সংগ্রহের কথা জানান তিনি।
শাহাবুদ্দিনের দোকানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কনগ্রেসের ক্যাটালগ থেকে শুরু করে পেঙ্গুইন ক্লাসিকসের মতো বিশ্বখ্যাত প্রকাশনীর অরিজিনাল বই। এসব বইয়ের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাধারণত ভাঙারিওয়ালারা কেজি দরে এসব বই সংগ্রহ করেন। এর মধ্য থেকে যেসব বই পুনরায় বিক্রিযোগ্য সেগুলোকে নিমতলিতে এনে বিক্রি করা হয়। সেখান থেকে আমরা ভালো বই, অরিজিনাল বই দেখে নিয়ে আসি। আবার অনেকে এসে ডেকে নিয়ে যায় পুরনো বই বিক্রি করবে বলে।’
কোন ধরনের বই বেশি চলে জানতে চাইলে তিনি জানান, নানা ধরনের ম্যাগাজিন, শিশুদের ক্ল্যাসিক সাহিত্য, চিকিৎসার বই, আইন, এনসাইক্লোপিডিয়া, দর্শন, মনোবিজ্ঞান, সাংস্কৃতিকসহ নানা ইংরেজি বই বেশি চলে। এছাড়া ম্যানুয়াল, টি-টেবল ক্যাটালগও অনেক চলে।
নীলক্ষেতের বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যে বই প্রতি ১০০ টাকা খরচ হয় সেই বই তারা ৫০০ থেকে হাজার টাকাতেও বিক্রি করেন। সেজন্য অনেক সময় দিনে দুটি বই বিক্রি হলেও দোকানের অনুষঙ্গিক খরচসহ তাদের লাভ থেকে যায়। মাস শেষে ফুটপাতের অধিকাংশ হকারেরই ৬০-৬৫ হাজার টাকা আয় হয় বলেই জানান তারা।
নীলক্ষেতের বিখ্যাত পুরনো বইয়ের দোকান ‘ভাই ভাই প্রকাশনীর’ বিক্রেতা শিমুল হোসেন জানান, তিনি কিছুদিন অনলাইনে বইয়ের ব্যবসা করলেও পরে বাদ দিয়েছেন। তবে অনলাইন বিক্রেতারা তার থেকে এসে বই কিনে নিয়ে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র তানভীর রশীদ বণিক বার্তাকে জানায়, আমাদের সিলেবাসে সাধারণত বিদেশী বইগুলো থাকে যেগুলোর মূল্য আকাশচুম্বী। তাই পিডিএফ, শিটের পাশাপাশি একাডেমিক বইয়ের জন্য পুরনো বইয়ের ওপর নির্ভরশীলতা থাকে। তিনি আরো জানান যে সেকেন্ড হ্যান্ড চাকরির প্রস্তুতির বইগুলোরও বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে।
নীলক্ষেতের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায় পল্টনের ফুটপাতের দোকানগুলোয়। বাইতুল মোকাররমের উল্টো পাশের ফুটপাতে বসে ২০০২ সাল থেকে পুরনো বই বিক্রি করেন আবুল খয়ের। ক্রেতা আকৃষ্ট করতে তার ভ্যানের ওপর মাইক্রোফোনে ক্রমাগত বাজছে- ‘১০০ টাকার বই অকশন অফারে নিন মাত্র ২০ টাকায়।’”সেখানে গিয়ে দেখা যায় যে অনেকটাই মানহীন, অখ্যাত লেখকদের বই বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে খুঁজে পাওয়া গেল বেগম রোকেয়ার লেখা ‘মতিচুর’ এর একটি দুর্লভ সংকলন।
আবুল খয়ের বলেন, ‘এই বই বিক্রি করেই জীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছি। কিন্তু এখন দিন চলানোটাই কষ্ট। করোনায় বই বিক্রির যে ডাউনফল শুরু হয়েছে তা দিনকে দিন বাড়ছে। তিনি মনে করেন যে, করোনায় দীর্ঘদিন মানুষ ঘরে বসে থাকায় হাতে হাতে স্মার্টফোনের প্রসার ও আসক্তি বেড়েছে। এভাবে মানুষের বইপ্রীতি নষ্ট হয়েছে।’
ফুটপাতে ক্রেতা কমলেও এখনো অনলাইনে পুরনো বইয়ের চাহিদাকে এ দোকানগুলো টিকে থাকার পেছনে একটি বড় কারণ হিসেবে দেখছেন পল্টনের আরেক বই বিক্রেতা আবুল কালাম। তিনি বলেন, বই বিক্রি করতে পারলে আমাদের অনেক লাভ থাকে। অনলাইন পেজ কিংবা ওয়েবসাইটের মালিকরা সরাসরি এসে বই কিনে নিয়ে যায় আমাদের থেকে। তারপর তারা অনলাইনে বইগুলো তিনগুণ বেশি দামে বিক্রি করে থাকেন।
পল্টন ও নীলক্ষেত ফুটপাতের বিক্রেতারা জানায়, সাধারণত রোজার মাসে বই বিক্রি কম হলেও বইমেলার প্রভাবে পুরনো বই বিক্রি কমে না।
বর্তমানে পুরনো বইয়ের অনলাইন বাজার বেশ জমজমাট। নীলক্ষেত ও মিরপুর-১০ নম্বরের প্রায় সব পুরনো বইয়ের দোকানদারের আছে একটা করে অনলাইন পেজ। এছাড়া ফেসবুকে রয়েছে নানা গ্রুপ, যার মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে যোগাযোগ সহজতর হচ্ছে। কুরিয়ারের মাধ্যমে ক্যাশ অন ডেলিভারি সুবিধাসহ খুব সহজেই দেশী-বিদেশী বই সারা দেশের পাঠকের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। নীলক্ষেতে অবস্থিত তেমনই একটি দোকান হলো বই বিচিত্রা। সরাসরি বিক্রির পাশাপাশি তারা অনলাইনেও ক্রেতাদের সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে।
১০ নম্বরে অবস্থিত ‘ভাই ভাই লাইব্রেরির’ অনলাইনে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মী জানায়, ফেসবুক গ্রুপ, অনলাইন পেজ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পুরনো বইয়ের বাজার নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। কুরিয়ার ও ক্যাশ-অন-ডেলিভারি সুবিধার কারণে বই এখন সহজেই দেশের নানা প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে পাঠকের হাতে। ফলে সরাসরি বিক্রি কমলেও অনলাইনের কারণে পুরনো বইয়ের দোকানগুলো টিকে আছে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাচ্ছে।
ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভরতা সারা পৃথিবীর মানসই অনেকখানি পালটালেও এখনো পাঠকরা চায় ক্ল্যাসিক সব কালোত্তীর্ণ লেখকদের পড়তে। ঈদে বই উপহারের ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও ফুটপাত থেকে অনলাইনে পুরনো বইয়ের নতুন বাজার গড়ে উঠেছে, যা বইপ্রেমীদের জন্য এক ধরনের আশার আলো বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।










