দেশের পণ্য খাতের ট্রেন চলাচল অস্বাভাবিক কমেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার, জ্বালানি ও খাদ্যশস্য পরিবহন সীমিত করার পর এবার লাভজনক পার্সেলবাহী ট্রেন চলাচলেও ছেদ পড়েছে। লোকোমোটিভ সংকটে কয়েক মাস ধরে অনিয়মিত হয়ে পড়া চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ রুটের ময়মনসিংহ মেইলের চলাচল সম্প্রতি কার্যত বন্ধ। অথচ পার্সেল পণ্য পরিবহনে রেলওয়ের অন্যতম লাভজনক ট্রেনটি দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের অন্যতম ভরসা। শুঁটকি, কৃষিপণ্য, জুতা, টায়ার, ফার্নিচারসহ নানা পণ্য কম খরচে পরিবহন করেন তারা। গত কিছুদিন ট্রেনটির সার্ভিস বন্ধ থাকায় বাড়তি খরচ গুনছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি দূরের জেলা ও স্টেশনকেন্দ্রিক বাজারগুলোয় স্বল্প পরিমাণ পণ্য পাঠানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, পূর্বাঞ্চলের অধীনে চট্টগ্রাম মেইল, ঢাকা মেইল, উদয়ন এক্সপ্রেস ও ময়মনসিংহ মেইলেই সবচেয়ে বেশি পার্সেল পণ্য পরিবহন হয়। এসব ট্রেনে নিয়মিত দুটি করে পণ্য পরিবহনের বিশেষ কোচ সংযুক্ত থাকে। তবে কয়েক মাস ধরে চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ রুটে চলাচলকারী ৩৭ নম্বর আপ ও ৩৮ নম্বর ডাউন ময়মনসিংহ মেইলের সার্ভিস অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। গত কয়েক দিনে ট্রেনটির চলাচল কার্যত বন্ধ। ১ আপ ঢাকা মেইল, ২ ডাউন চট্টগ্রাম মেইল এবং উদয়ন এক্সপ্রেসের আপ ও ডাউন ট্রেনে পার্সেলবাহী কোচ সংযুক্ত করাও অনিয়মিত।

ময়মনসিংহ মেইলের সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে রেলওয়েকে চিঠিও দিয়েছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপককে (জিএম) দেয়া ওই চিঠিতে তারা জানিয়েছেন, ৪০ বছর ধরে চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা ময়মনসিংহগামী ৩৭ ও ৩৮ নম্বর ট্রেনে পণ্য আনা-নেয়া করছেন। বিশেষ করে শুকনো কৃষিপণ্য, শুঁটকি, আদা, টায়ার, জুতা, তুলা ও ফার্নিচার পরিবহনে এ ট্রেন ব্যবহার করেন তারা। কিছুদিন ধরে ট্রেনটি অনিয়মিতভাবে চললেও সম্প্রতি সার্ভিস কার্যত বন্ধ। এতে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি এ রুটের বিভিন্ন স্টেশনকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী, শ্রমিক-কুলিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ কর্মহীনতা ও ব্যবসায়িক মন্দার মুখে পড়েছেন বলে চিঠিতে দাবি করা হয়েছে।

জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লোকোমোটিভ সংকটে রেলের সার্ভিস পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে ময়মনসিংহ মেইলের মতো ট্রেনের সার্ভিসও অনিয়মিত হয়েছে, এটা সাময়িক। ব্যবসায়ীদের দাবির পাশাপাশি রেলের রাজস্ব আয় ধরে রাখতে ট্রেনটি চালু করা জরুরি।’ রেলের মিটার গেজ লোকোমোটিভগুলো মেরামতের মাধ্যমে সচল করা গেলে শিগগিরই ময়মনসিংহ রুটের জনপ্রিয় ট্রেনটি আবারো চালু করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

রেলেওয়ের তথ্যমতে, মে মাসে ৩৭ নম্বর আপ ময়মনসিংহ মেইলে (চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ) ৬ হাজার ৩৬২টি প্যাকেজে ২ লাখ ৭২ হাজার ৪১৫ কেজি পণ্য পরিবহন করে ৬ লাখ ১৮ হাজার ৬০০ টাকা আয় করেছে রেলওয়ে। একই মাসে ১ নম্বর আপ চট্টগ্রাম-ঢাকা মেইলে ৩ হাজার ৪০টি প্যাকেজে ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৫০ কেজি পণ্য পরিবহন করে আয় হয়েছে ১১ লাখ ৭৩ হাজার ২৩৩ টাকা। এছাড়া ৭২৩ নম্বর উদয়ন এক্সপ্রেসে (চট্টগ্রাম-সিলেট) ৭ হাজার ১০১টি প্যাকেজ পরিবহন করে আয় হয়েছে ৪ লাখ ৬২ হাজার ৫৬০ টাকা। সব মিলিয়ে মে মাসে এ তিন ট্রেন থেকে রেলওয়ের আয় হয়েছে ২২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৯৩ টাকা। এ সময়ে মোট ৬ লাখ ৫৭ হাজার ৮৮০ কেজি পার্সেল পণ্য পরিবহন করা হয়েছে।

এছাড়া জুনে ১৬ হাজার ২৪৪টি বুকিংয়ে ৬ লাখ ৬০ হাজার ৮৫৫ কেজি পণ্য পরিবহন করে রেলওয়ের আয় হয়েছে ৩১ লাখ ৬৩ হাজার ১২৬ টাকা। জুলাইয়ে ১৭ হাজার ৬৪০টি বুকিংয়ে ৭ লাখ ৪৩ হাজার কেজি পণ্য পরিবহন করে আয় হয়েছে ৩০ লাখ ৪৩ হাজার ৪০১ টাকা। এর মধ্যে জুনে ৩৭ নম্বর ময়মনসিংহ মেইলে ৬ হাজার ৬৭টি বুকিং থেকে রেলের আয় ছিল ৬ লাখ ৪২ হাজার ৯৭০ টাকা। জুলাইয়ে একই ট্রেনে ৬ হাজার ৮৭৯টি বুকিং থেকে আয় হয় ৬ লাখ ৮১ হাজার ৬০ টাকা।

চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাসেম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. আবদুর রহিম বণিক বার্তাকে জানান, চট্টগ্রাম থেকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্য পাঁচ-ছয়টি জেলায় সরবরাহে এ ট্রেনের পার্সেল সুবিধা ব্যবহার করেন ব্যবসায়ীরা। কম পরিবহন ব্যয়, যোগাযোগ সুবিধা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি রেলওয়ে স্টেশনকেন্দ্রিক বাজারগুলোয় পণ্য পৌঁছানো সহজ হওয়ায় তারা রেলের ওপর নির্ভর করেন। অন্যদিকে বাস বা কুরিয়ার সার্ভিসে এসব বাজারে পণ্য পাঠাতে নানা বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়। কিছুদিন ধরে সার্ভিস অনিয়মিত হতে হতে একপর্যায়ে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের স্বার্থে দ্রুত এ সার্ভিস চালু করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ময়মনসিংহ মেইলে প্রতি মাসে ছয়-সাত হাজার পার্সেল বুকিং হয়। ট্রেনটিতে দুটি পার্সেল ওয়াগন যুক্ত থাকে। পথে চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও টাঙ্গাইলের প্রায় ৫০টি ছোট-বড় স্টেশনে যাত্রাবিরতির মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের পণ্য ওঠানো-নামানো হয়।

রেলওয়ে ও ব্যবসাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৩৭ ও ৩৮ নম্বর ময়মনসিংহ মেইলে পার্সেল পণ্য পরিবহনের ওপর ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি হাজারো শ্রমিক, কুলি ও পরিবহন শ্রমিক নির্ভরশীল। বিশেষ করে চট্টগ্রাম থেকে টাঙ্গাইল পর্যন্ত বিভিন্ন স্টেশনে ট্রেনটির পণ্য ওঠানো-নামানোর সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকরা এখন কাজ ও আয়ের সংকটে পড়েছেন। এছাড়া সার্ভিস চালু থাকা ১ আপ ও ২ ডাউন চট্টগ্রাম-ঢাকা মেইল এবং উদয়ন এক্সপ্রেসে অনিয়মিতভাবে পার্সেল কোচ সংযুক্ত করায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে রেলের পণ্য খাতের রাজস্ব আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি পরিমাণের পণ্য পরিবহনে রেলওয়ের সেবা তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক। প্রতি কেজি পণ্য পরিবহনে রেলওয়েকে ২ টাকা ৬২ পয়সা দিতে হয়। কম খরচে ও নিরাপদে গ্রাহক বা ব্যবসায়ীদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেয়া যায় বলে তারা রেলওয়েকে বেছে নেন। বিশেষ করে তরুণ ও স্বল্প পুঁজির ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের জন্য কুরিয়ার সার্ভিস, বাস বা অন্য মাধ্যমে পণ্য পরিবহন তুলনামূলক ব্যয়বহুল। এছাড়া চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের কাছেই রিয়াজউদ্দিন বাজার, টেরিবাজার, খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই, আছদগঞ্জ ও ফিশারিঘাটের মতো বড় বাজার থাকায় রেলের পার্সেল সার্ভিস ব্যবসায়ীদের কাছে জনপ্রিয়।

চট্টগ্রাম থেকে শুঁটকি, মাছ, টায়ার ও বিভিন্ন যানবাহনের যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি দুই দশক ধরে ময়মনসিংহ মেইলের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি জেলার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছি। অন্য মাধ্যমে পণ্য পরিবহনে বিড়ম্বনার পাশাপাশি খরচও বেশি। ছোট ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন পরিমাণের পণ্য পরিবহনে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী এ রেলসেবা এখন বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রামের হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পক্ষে এরই মধ্যে রেলওয়ে প্রশাসনের কাছে দ্রুত সার্ভিস চালুর আবেদন জানিয়েছি। কিন্তু লোকোমোটিভ সংকটের কারণে ময়মনসিংহ মেইল চালুর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি রেলওয়ে প্রশাসন।’

পরিবহন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে চলাচলকারী ৩৭ আপ ময়মনসিংহ মেইল গত ১৭, ২০, ২৩, ২৬ ও ২৯ জুন চলাচল করেনি। ফলে ৩৮ নম্বর ডাউন ট্রেনটির সার্ভিসও বন্ধ ছিল। ২, ৫, ৮, ১১, ১৪, ২০, ২৩ ও ২৬ জুলাই ট্রেনটির সার্ভিস বন্ধ রাখা হয়। ১, ৪, ৭, ১০, ১৩, ১৬ ও ১৯ আগস্টও ৩৭ নম্বর ময়মনসিংহ মেইল চলেনি। এরপর ২১ থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত সার্ভিস বন্ধ থাকার পর ৩০ আগস্ট একবার ট্রেনটি চালানো হয়। তবে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আর কোনো সার্ভিস চালু করতে পারেনি রেলওয়ে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁঞা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লোকোমোটিভ সংকটের প্রভাব যাত্রী ও পণ্যবাহী উভয় ধরনের ট্রেন চলাচলেই পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ যাত্রীবাহী আন্তঃনগর ট্রেনগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কিছু ট্রেনের যাত্রা অনিয়মিতভাবে বাতিল করা হচ্ছে কিংবা সাময়িকভাবে সার্ভিস বন্ধ রাখা হচ্ছে। লোকোমোটিভ মেরামত করে দ্রুত পরিবহন বিভাগে সরবরাহের মাধ্যমে এসব সার্ভিস সচল করার চেষ্টা চলছে।’ ময়মনসিংহগামী ৩৭ আপ ট্রেনের সার্ভিস নিয়মিত করতে এরই মধ্যে প্রকৌশল বিভাগের সঙ্গে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।