বন্যার তোড়ে বহু বসতঘর ধসে পড়েছে, সড়ক ও কালভার্ট ভেঙে গেছে, ফসলি জমি ও সবজিখেত তলিয়ে নষ্ট হয়েছে। মাছের ঘের ডুবে যাওয়ার পাশাপাশি গবাদিপশুর খামারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আউশের ভরা মৌসুমে তলিয়ে গেছে পাকা ধান, নষ্ট হয়েছে আমনের বীজতলা ও সবজিখেত। ফসল হারিয়ে অনেক কৃষক এখন নতুন করে চাষাবাদের প্রস্তুতি নিতে বীজের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। কেউ আবার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে হালি চারা সংগ্রহ করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।

ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, জেলায় উজানের ঢল ও ভারি বৃষ্টিতে কমলগঞ্জ, রাজনগর, কুলাউড়া ও সদর উপজেলার ২৮টি ইউনিয়নে বন্যা হয়। পানিতে কাঁচা ও আধাপাকা অনেক ঘর ধসে পড়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বন্যায় জেলার কমলগঞ্জ, রাজনগর, কুলাউড়া ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় কাঁচা ও আধাপাকা ৩ হাজার ৯৩২টি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৯৩টি এবং আংশিক ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ৪৩৯টি।

কমলগঞ্জের প্রান্তিক কৃষক সুবিমল সিংহ ১২ বিঘা জমির জন্য আমনের বীজতলা তৈরি করেছিলেন, কিন্তু ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে সৃষ্ট বন্যায় সম্পূর্ণ বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। ঘরে আর কোনো বীজ না থাকায় নতুন করে চারা লাগানোর অনিশ্চয়তায় বিচলিত তিনি। সুবিমল সিংহ বলেন, ‘এখন আর আমার কাছে কোনো বীজ নেই যে চারা লাগাব। আমনের চাষাবাদ নিয়ে আমার মতো এ এলাকার অনেক চাষী চিন্তিত। সরকার যদি পাশে দাঁড়ায়, তাহলে হয়তো ঘুরে দাঁড়াতে পারব।’

রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের আকুয়া গ্রামের ইদ্রিস মিয়া বলেন, ‘বোরো মৌসুমে হাওরে যারা চাষাবাদ করেছিলাম, আমাদের পাকা ধান তলিয়ে যায়। এখন আবার হালি চারা ও আউশ তলিয়েছে। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ।’

বন্যায় কমলগঞ্জের গ্রাফটিং টমেটো চাষের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন এনজিও ও ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে করা টমেটো খেত ও চারার নার্সারি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষীরা। বনগাঁও গ্রামের টমেটোচাষীরা জানান, তাদের গ্রামের অধিকাংশই নার্সারি করে টমেটো চারা উৎপাদন করেন। স্থানীয় টমেটোচাষীরা ছাড়াও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী হবিগঞ্জ জেলা থেকে কৃষক এ চারা কিনে নিয়ে যান। গ্রামের অনেকে আবার টমেটো খেত করেন। কেউ কেউ চারা উৎপাদন ও খেত দুটোই করেন। অধিকাংশ কৃষক চাষাবাদের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও এনজিওর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চাষ করেন। কিন্তু বন্যায় টমেটো খেত ও চারার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. জালাল উদ্দিন জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বীজ বিতরণ করা হবে। এখনো যে সময় আছে, তাতে আমন চাষে কোনো প্রভাব পড়বে না। কৃষি বিভাগ কৃষকদের পাশে আছে।