চিকিৎসা চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে খুলনা নগরের পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়েও বাড়ছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই অনুমোদনহীন। স্বাস্থ্য বিভাগে নির্ধারিত চিকিৎসক ও নার্স নেই। তার পরও সেখানে জটিল রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অপারেশনও করা হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত দালালের খপ্পরে পড়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছে সাধারণ রোগীরা।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে কেন্দ্র করে আশপাশে গড়ে উঠেছে শতাধিক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই দালালের মাধ্যমে রোগীদের প্রলোভন দেখিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে চলছে চিকিৎসার নামে বাণিজ্য।
খুলনা মেডিকেল কলেজের সামনে অবস্থিত সিটি ম্যাক্স হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, রোগীদের অপারেশনে পেথেডিন ও মরফিন ইনজেকশনের প্রয়োজন হলেও তাদের তা ব্যবহারের অনুমতি নেই।
প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হরিশ চন্দ্র মণ্ডল বলেন, ‘আমরা স্বল্প পরিসরে অপারেশন শুরু করেছি। হাসপাতালের অনুমোদন এবং পেথেডিন ও মরফিন ব্যবহারের অনুমতির জন্য আবেদন করেছি।’
একটু সামনে খুলনা স্কয়ার ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার। সেখানে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের তালিকায় দেখা যায় নগরের প্রায় ২০ জন নামকরা চিকিৎসকদের নাম। এর পাশে হিউম্যান কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্যাথলজিক্যাল ল্যাব। সেখানে পরীক্ষার নামে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেয়া এবং একই পরীক্ষায় একেক রোগীর কাছ থেকে একেক রকম অর্থ নেয়ার স্লিপও মেলে। এছাড়া ফাঁকা প্যাডে টেকনিশিয়ানদের ছাপানো নামও পাওয়া যায়।
নগরের সোনাডাঙ্গা আউটার বাইপাস সড়কে জেনারেল ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারে প্রবেশের পর জানা গেল, সেখানে ক্যানসার নিয়ে গবেষণা এবং বায়োপসির মতো স্পর্শকাতর পরীক্ষাও করা হয়। যদিও তাদের অনুমোদন নেই। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছি। দ্রুত পেয়ে যাব।’
দৌলতপুর পলি চক্ষু ক্লিনিকের নিবন্ধন স্থগিত করা হলেও ক্লিনিকের স্বত্বাধিকারী রোকসানা জেসমিনের স্বামী ডা. নজরুল ইসলাম নিজ চেম্বার দেখিয়ে চালু রেখেছেন ক্লিনিকটি। শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের সামনে শেখ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি ছোট ছোট রুমে চলছে স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার মতো কর্মকাণ্ড। ডায়াগনস্টিক সেন্টারটির সামনেই কয়েকজন দালালকে বসে থাকতে দেখা যায়। যাদের দিয়ে সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী বাগিয়ে আনা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাপে আছি। ব্যবসাও ভালো যাচ্ছে না।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশির ভাগই অনুমোদনহীন এসব ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। ভুল পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে হয়রানি, সার্বক্ষণিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকা এমনকি রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।
এ বিষয়ে খুলনা সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি কুদরত-ই-খুদা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে চিকিৎসাসেবা বড় বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মনিটরিং করতে ব্যর্থ খুলনার স্বাস্থ্য বিভাগ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অব্যবস্থাপনা ও উদাসিনতায় সক্রিয় মানহীন এসব প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোয় সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা প্রভাবিত হন। অধিকাংশ চিকিৎসকই একাধিক ক্লিনিকে চুক্তিবদ্ধ। অনেক চিকিৎসক আবার নিজেরাই ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।’
খুলনা সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার ডা. সাদিয়া মনোয়ারা ঊষা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিটি ১০ শয্যা ক্লিনিকের জন্য তিনজন ডাক্তার, ডিপ্লোমাধারী দুজন নার্স ও তিনজন সুইপার থাকা বাঞ্ছনীয়। ৮০০ বর্গফুট জায়গা, সার্বক্ষণিক একজন ডাক্তার, নার্স ও সুইপার থাকতে হবে। প্যাথলজি বিভাগ চালু করতে হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ডিপ্লোমাধারী প্যাথলজিস্ট ও একজন সুইপার থাকতে হবে। একই সঙ্গে মাইক্রোস্কোপ, ফ্রিজ, মেডিকেল যন্ত্রপাতি, অপারেশন থিয়েটার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’
অভিযোগ রয়েছে, নগর এবং উপজেলার বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোয় এসব নিয়ম প্রতিপালন করা হয় না। উপরন্তু সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী বাগিয়ে নিয়ে কমিশন নিচ্ছে দালাল চক্র।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে নামেই ডাকা হোক, কমিশনের টাকা শেষমেশ আদায় করা হয় রোগীর কাছ থেকেই। দালাল চক্রের কমিশন বাণিজ্যের কারণেই ক্রমাগত বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়। অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার পাশাপাশি অপারেশনও করা হচ্ছে। ফলে ভালো ফল পেতে ডাক্তার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একই পরীক্ষা এবং অপারেশন করতে হচ্ছে বারবার। এতে রোগীর আর্থিক ক্ষতির সঙ্গে চিকিৎসায় সময়ও বেশি লাগছে।
ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. মো. সবিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমাদের মনিটরিং টিম মাঠে কাজ করছে। কোনো ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পেলে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
এ প্রসঙ্গে খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মো. মনজুরুল মুরশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা অনুমোদনহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা অব্যাহত রেখেছি। তবে জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে সমস্যা হচ্ছে।’ নির্বাহী ক্ষমতা না থাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে না পারার কথাও জানান তিনি।










