যুদ্ধবিধ্বস্ত ঘরবাড়ি ও ধ্বংসপ্রাপ্ত চারপাশ। যুদ্ধের ভয়াল থাবায় রক্ষা পায়নি শিশুদের খেলার মাঠও। ভেঙে গেছে শিশুদের ডাক্তার, লেখক কিংবা ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার স্বপ্ন। গাজার শিশুরা তাদের রঙ-তুলিতে প্রকাশ করেছে হৃদয় ভাঙা এমনই কঠিন বাস্তবতা। গত ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে শিশুদের মনোদুঃখমাখা এসব ছবি প্রকাশ করেছে ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’। এ যেন শুধু ছবিই নয়; দুই বছরের যুদ্ধ তাদের জীবনকে কীভাবে বদলে দিয়েছে এবং কীভাবে ভেঙেছে কচিমনের স্বপ্ন, তারই অকাট্য দলিল।
সংস্থাটির মনঃসামাজিক সহায়তা কর্মসূচির অংশ হিসেবে গাজার কিছু শিশুবান্ধব স্থানে ছবি আঁকার এ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। এ স্থানগুলো এমন জায়গা, যেখানে শিশুরা খেলতে পারে, যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সঙ্গে মানিয়ে নিতেও শিখেছে। আবার তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখারও সুযোগ পায়।
কর্মসূচিতে অনেক শিশু তাদের ছবিতে দেখিয়েছে গাজার ওপর চলমান নিরবচ্ছিন্ন বোমাবর্ষণ, ভয় ও আতঙ্ক। কেউ এঁকেছে মিসাইলের আঘাতে ধসে পড়া ঘরবাড়ি, আকাশে উড়ে চলা যুদ্ধবিমান কিংবা উদ্বাস্তু জীবনের দৃশ্য।

একটি শিশুর আঁকা ছবিতে দেখা যায়, সে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ স্বপ্ন দেখছে একদিন পড়াশোনা শেষ করে সে ডাক্তার হবে! অন্য শিশুদের ছবিতে আছে তাদের ভ্রমণের ইচ্ছা ও আকুতি। কারো ছবিতে সুন্দর আগামী, খাবারে ভরা থালা, অক্ষত ঘরবাড়ি, প্রজাপতি, ফুল আর বোমামুক্ত নীল আকাশের স্বপ্ন।
যখন এ শিশুদের স্বপ্নগুলো রঙ-তুলি ও কাগজে ফুটে উঠছে, তখন গাজার যুদ্ধ তৃতীয় বছরে প্রবেশ করছে। এ সময়ে শিশুরা প্রত্যক্ষ করেছে অকল্পনীয়-অপ্রত্যাশিত দুর্ভোগ। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ২০ হাজারেরও বেশি শিশু নিহত হয়েছে। অর্থাৎ সেখানে প্রতি ঘণ্টায় একজনের বেশি শিশু মারা গেছে।
গত আগস্টে গাজা শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়। এ দুর্ভিক্ষ খুব দ্রুত অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে বলে পূর্বাভাসও দেয়া হয়। বর্তমানে আনুমানিক ১ লাখ ৩২ হাজার পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মারাত্মক অপুষ্টির কারণে মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে।
২০২৩ সালে যুদ্ধ শুরুর আগেই গাজার শিশুরা মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে ভুগছিল। এর পেছনে কারণ ছিল বারবার সংঘাত, ২০০৭ সাল থেকে চলমান অবরোধের প্রভাব, চলাফেরার স্বাধীনতায় বাধা, প্রয়োজনীয় সেবায় প্রবেশাধিকার সীমিত রাখা, অর্থনৈতিক পতন এবং পরিবার ও বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া।

সেভ দ্য চিলড্রেনের মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর ও পূর্ব ইউরোপের আঞ্চলিক পরিচালক আহমাদ আলহেনদাওয়ি বলেন, ‘এ ছবিগুলো গাজার শিশুদের জীবন্ত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। যেখানে একদিকে তাদের স্বপ্ন, অন্যদিকে তাদের কঠিন বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। এ ছবি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, গাজার শিশুরা কী কামনা করে। ছবিগুলোয় আছে, যে জিনিসগুলো প্রত্যেক শিশুর অধিকার হওয়া উচিত, কিন্তু তারা তা থেকে বঞ্চিত—যেমন খাবার, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও সুন্দর ভবিষ্যতের আশা।’
গাজায় সম্প্রতি যুদ্ধবিরতি হয়েছে। তবে কাটেনি অনিশ্চয়তা। ইসরায়েলি হামলায় মানুষ মরছে এখনো।
বোমার শব্দে কেঁপে ওঠা আকাশের নিচে থেকেও গাজার শিশুরা এখনো বিশ্বাস করে, একদিন সবকিছু বদলে যাবে—আকাশে যুদ্ধবিমান নয়, উড়বে প্রজাপতি; শিশুমনে আতঙ্ক নয়, হাতে খাবারের থালা নয়, থাকবে রঙ-তুলি, যা দিয়ে আর কখনো যুদ্ধের ছবি আঁকতে হবে না।
[মাকতুবমিডিয়া ডটকমে প্রকাশিত ‘চিলড্রেনস ড্রয়িংস অব ফিউচার্স শ্যাটার্ড বাই টু ইয়ার্স অব ওয়ার ইন গাজা’ শীর্ষক প্রতিবেদন অবলম্বনে রচিত]





