ইলেকট্রনিকস জায়ান্ট স্যামসাং। এর পেছনে আছে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি পরিবার। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো তারা এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম ব্যক্তিগত শিল্প সংগ্রহ গড়ে তুলেছে। কনগ্লোমারেটটির চেয়ারম্যান লি কুন-হির মৃত্যুর পর হাজার হাজার অমূল্য শিল্পকর্ম সরকারি মালিকানায় এসেছে। এখন এ সংগ্রহকে নতুনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। শিল্পকর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে কোরিয়ার সংস্কৃতি প্রচারের উদ্দেশ্যে। কোরিয়ার সফট পাওয়ার ছড়িয়ে দেয়ার এটি একটি অংশ।

২০২১ সালে লি কুন-হির এস্টেট দক্ষিণ কোরিয়াকে ২৩ হাজার ‘সামগ্রী’ উপহার দিয়েছিল। ধারণা করা হয়, ১২ ট্রিলিয়ন ওন বা ৮২০ কোটি ডলার উত্তরাধিকার কর সমঝোতা করার জন্য তারা দেশকে এ উপহার দিয়েছিল। এর মধ্যে ২০০টিরও বেশি সামগ্রী (যার মধ্যে শিল্পকর্ম রয়েছে) নিয়ে এ মাসে ওয়াশিংটন ডিসির স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব এশিয়ান আর্টে প্রদর্শনী হতে যাচ্ছে।

স্মিথসোনিয়ানের কিউরেটররা ‘কোরিয়ান ট্রেজারস: কালেক্টেড, চেরিশড, শেয়ার্ড’ শিরোনাম দিয়েছে তাদের নির্বাচিত সামগ্রীগুলোর। এগুলো সব মিলিয়ে দেড় হাজার বছরের ইতিহাস ধারণ করে। এগুলো দর্শককে কোরিয়ার আধুনিক পরিচয়ের শেকড় ও বিবর্তনের ঝলক দেখায়।

13

এ সামগ্রীগুলোর মধ্যে রয়েছে বিরল বৌদ্ধ ভাস্কর্য ও পবিত্র পুঁথি থেকে শুরু করে প্রাচীন আসবাব এবং বিশ শতকের শিল্পীদের আঁকা চিত্রকর্ম। শিল্পীদের মধ্যে আছেন ই লি উংনো ও কিম হোয়ানকি। তারা আধুনিক বিশ্বের প্রেক্ষাপটে কোরিয়ান চিত্রকলাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। এ সংগ্রহ শুরু করেছিলেন স্যামসাং প্রতিষ্ঠাতা লি বিয়ং-চুল। পরবর্তী সময়ে তার হাল ধরেন লি কুন-হি। বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করেন, এ সংগ্রহ ব্যাপ্তি ও পরিসরে অভূতপূর্ব।

স্যামসাং বিলিয়নেয়ারের পরিবারের পক্ষ থেকে দানকৃত ২৩ হাজার সামগ্রীর প্রায় সবই গেছে কোরিয়ার ন্যাশনাল মিউজিয়াম ও ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব মডার্ন অ্যান্ড কনটেম্পোরারি আর্টে। প্রতিষ্ঠান দুটির কিউরেটররা স্মিথসোনিয়ানের সঙ্গে এ প্রদর্শনীতে সহযোগিতা করেছেন।

ওয়াশিংটন ডিসির প্রদর্শনীতে কয়েকটি বিভাগ কোরিয়ার শেষ রাজবংশ জোসন বংশের (১৩৯২-১৯১০ খ্রি.) প্রতি উৎসর্গ করা হয়েছে। কিউরেটররা দরবারি শিল্প ও আনুষ্ঠানিক বস্তুগুলো প্রদর্শনের মাধ্যমে বিদ্বান অভিজাতদের রুচি ও নৈতিকতা তুলে ধরেছেন। এর মাধ্যমে কোরিয়ার সংস্কৃতিকে গড়ে তোলা আদর্শ, নন্দনশাস্ত্র ও পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থার ধারণা দেয়। প্রদর্শনীতে বৌদ্ধ ধর্ম ও কোরীয় উপদ্বীপে তার উত্তরাধিকারের পাশাপাশি আধুনিক শিল্পীরা কোরিয়ান যুদ্ধ এবং দেশ ও বিশ্বের নাটকীয় পরিবর্তনের সঙ্গে কীভাবে লড়াই করেছেন, তার প্রতিফলনও রয়েছে।

14

আয়োজনটি কোরিয়াকে একটি নতুন পরিচয় দান করবে। ওয়াশিংটন ডিসির এ প্রদর্শনীর কিছু সামগ্রী শিকাগো ও লন্ডনেও আগামী বছর প্রদর্শিত হবে। সময়টা এমন যখন কে-বিউটি থেকে কে-পপ পর্যন্ত কোরিয়ান সবকিছুর প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। ফলে এ প্রদর্শনী ও স্যামসাং বিলিয়নেয়ারের শিল্প সংগ্রহ কাজ করবে দক্ষিণ কোরিয়ান সফট পাওয়ারের বিস্তারে।

এ নিয়ে স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব এশিয়ান আর্টের পরিচালক চেজ এফ রবিনসন সিএনএসকে বলেন, ‘বিশ্বের সংস্কৃতিতে (পপ-কালচার) কোরিয়া চমৎকার অবদান রাখছে। কিন্তু কোরীয় সংস্কৃতি ১০ বা ১৫ বছর আগে শুরু হয়নি, ঠিক না? কোরিয়ান সংস্কৃতির যে গভীর ও বিস্তৃত ভাণ্ডার রয়েছে, বাস্তবে তা দেখার একটি সুযোগ এ প্রদর্শনী।’

রবিনসনের মতে, বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে এশিয়ান আমেরিকান সম্প্রদায়ের আকার, প্রভাব ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতা ক্রমেই বাড়ছে।

কোরিয়ার বিস্তৃত সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক উপাদানের সঙ্গে বহির্বিশ্ব খুব বেশি পরিচিত না। স্যামসাং বিলিয়নেয়ারের এ সংগ্রহ নিয়ে প্রদর্শনীর বেশির ভাগ বস্তুই প্রথমবারের মতো কোরিয়ার বাইরে প্রদর্শিত হচ্ছে। জাদুঘরের ‘সমসাময়িক এশীয় শিল্প’র সহযোগী কিউরেটর ক্যারল হু বলেন, ‘কোরিয়ার ঐতিহ্য বহুমাত্রিক ও বিপুলভাবে সমৃদ্ধ। সেই সমৃদ্ধি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরার এ আয়োজন নিঃসন্দেহে অসাধারণ।’

হুর আগ্রহ এবং বিশেষত্ব বিশ ও একুশ শতকের সেই শিল্পীদের কাজে, যারা আধুনিকায়ন এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কাজ করেছেন। কেননা এ সময়ে কোরিয়া শতাব্দীর বিচ্ছিন্নতার পর হঠাৎই নিকটবর্তী প্রতিবেশীর বাইরের বৈশ্বিক প্রভাবের মুখোমুখি হয়।

15

এক শতাব্দীর মধ্যে দেশটি সাম্রাজ্য থেকে জাপানি উপনিবেশে পরিণত হয়। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রুশ নিয়ন্ত্রিত উত্তর ও মার্কিন প্রশাসিত দক্ষিণে বিভক্ত হয়ে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। দক্ষিণ কোরিয়া এখন উদার গণতন্ত্র চর্চা করে।

ক্যারলের মতে, বিংশ শতাব্দীর প্রায় ৩০০ শিল্পীর কাজসহ লি পরিবারের উপহারটি সমসাময়িক কোরীয় শিল্পের ইতিহাসের একটি শূন্যতা পূরণ করে।

স্মিথসোনিয়ানের নির্বাচনে রয়েছে কিম হোয়ানকির মতো শিল্পীদের কাজ। তিনি ছিলন একরঙা দানসেকহোয়া আন্দোলনের একটি বিশিষ্ট নাম। এ আন্দোলনের সদস্যরা অর্থের সরাসরি ইঙ্গিত এড়াতে বিমূর্ততার আশ্রয় নিয়েছিলেন। আংশিকভাবে কঠোর সরকারি সেন্সরশিপের ভয় ছিল। এছাড়া রয়েছে লি উংনো ও পার্ক স্যাংগোয়াংয়েন কাজ। তারা মিনজুং (জনগণের শিল্প) আন্দোলনের অংশ ছিলেন। এ আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ১৯৭০ ও আশির দশকে গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার এগিয়ে নেয়া।

প্রদর্শনীর ক্যাটালগে লেখা রয়েছে, ‘যখন খুব কম লোকই গুরুত্ব দিত, তখনই দূরদর্শিতার সঙ্গে আধুনিক চিত্রকর্ম সংগ্রহ করেছিল লি পরিবার।’

এ সংগ্রহ একটি উত্তরাধিকারকেও প্রকাশ করে। শতাব্দী ধরে কোরিয়ার বহু শিল্প নিদর্শন বিদেশে পাঠানো হয়েছিল, হারিয়ে গিয়েছিল বা ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল জাপানি ঔপনিবেশিক সরকারের হাতে। তারা এমনকি কোরিয়ান ভাষাকেই নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল। এ বিষয়কে লক্ষ্য করে স্যামসাং প্রতিষ্ঠাতা লি বিয়ং-চুল কোরিয়ার ইতিহাস থেকে শিল্পকর্ম পুনরুদ্ধারের প্রেরণা পান।

আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আর বিদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বা হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়।’ লি পরিবার গত কয়েক দশকে কোরিয়ার বিভিন্ন জাদুঘরে বিভিন্ন উপহার দিয়েছে এবং ২০২১ সালের বিশাল দানের পরও পরিবারটির কাছে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিগত সংগ্রহ রয়ে গেছে, যার কিছু সিউলের স্যামসাং পরিচালিত লিয়ুম মিউজিয়াম অব আর্টে প্রদর্শিত হচ্ছে, যেখানে পরিবারটি তাদের সংগ্রহের ঐতিহ্য চালিয়ে যাচ্ছে।

অবশ্য লি কুন-হির শিল্পকর্ম সংগ্রহ করা বিতর্কহীন ছিল না। ২০০৭ সালে সাবেক স্যামসাং আইনজীবী কিম ইয়ং-চুল অভিযোগ করেন, তিনি কোম্পানির গোপন তহবিল ব্যবহার করে দামি শিল্পকর্ম কিনেছেন। এ অভিযোগের তদন্তের পর ২০০৮ সালে কর ফাঁকির দায়ে তার দণ্ড হয়।

শিল্পীদের অনেকের মতো লি পরিবারও কোরিয়ার ঐতিহ্য নিয়ে ভাবিত হয়েছে। তারা আধুনিক বিশ্বে কোরিয়ান ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চিন্তা করেছেন। সেই ভাবনারই প্রতিফলন হতে যাচ্ছে আসন্ন প্রদর্শনীতে, যা কোরিয়ান ঐতিহ্য তুলে ধরার পাশাপাশি তা প্রচারেও সহায়তা করবে।