ফরাসি চিত্রশিল্পী ও প্রিন্টমেকার জেমস তিসো চিত্রকর্মটি তৈরি করেন ১৮৭২ সালে, নাম দ্য কনভালেসেন্ট। দেখা যায়, একটা তরুণী ঘরের চেয়ারে বিশ্রাম নিচ্ছে। ঘরটা সবুজ গাছে পূর্ণ। তরুণীর ছেড়ে দেয়া চুল তার পিঠ বেয়ে নেমে গেছে নিচে। পরনে তার দীর্ঘ এমব্রয়ডারি করা হাউজকোট। হাতটা রেখেছে কাজ করা বালিশের ওপর। তার হাউজকোট, বর্ণিল বালিশ ও গাছ দিয়ে গৃহসজ্জা উনিশ শতকের শেষ দিকে ইউরোপকেই চিহ্নিত করে। তখন এটাই ছিল ইউরোপের ফ্যাশন ট্রেন্ড।
চিত্রকর্মের তরুণী যেন বাইরের গতিশীল দুনিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। বরং এখন তার সময় অতিবাহিত হচ্ছে শান্ত ও নিস্তেজ অবসরে। যেন সে অপেক্ষা করছে তার স্বাস্থ্যের ফিরে আসার জন্য। তিসোর চিত্রকর্মটি বাড়ির আন্দরে বিশ্রামরত অভিজাত নারীর মধ্য দিয়ে একটি স্তরায়িত সমাজের বাস্তবতাকে তুলে ধরে। সে সময় অভিজাত শ্রেণীর নারীদের কর্মজীবী শ্রেণীর তুলনায় অনেক বেশি অবসর সময় ছিল। যদিও শিল্প সবসময়ই শিল্পীর কল্পনা। তার পরও দ্য কনভালেসেন্টের মতো চিত্রকর্মে আধুনিক সমাজের ভেতরে যেন একটা অস্বস্তি দেখতে পান, যা নারীদের সংগ্রামে টেনে এনেছে। তরুণীর মুখাবয়ব শান্ত, তবে দৃষ্টি কিছুটা পাশে রাখা। এ চিত্রকর্মের মাধ্যমে তিসো ভিক্টোরীয় যুগের ঘরোয়া জীবনের ধীরগতির সঙ্গে তার চারপাশের দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীর বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন।

তিসো খ্যাতি অর্জন করেছিলেন ভিক্টোরীয় আমলের চিত্রকলার জন্য। তিনি তার কাজের মাধ্যমে উনিশ শতকের শেষভাগে আধুনিক নারীর জীবনের জটিলতাগুলো প্রকাশ করেছিলেন। কাজগুলো আধুনিকতার দ্রুতগতির সঙ্গে প্রকৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের ধীরগতির মধ্যে দ্বন্দ্বের অন্বেষণ করে।
চিত্রকর্মটি তিসোর অন্যান্য কাজের মতো ভিক্টোরিয়ান সমাজের গ্রহণযোগ্য ঘরোয়া জীবনের দিকগুলোও তুলে ধরে। আধুনিক জীবনের দ্রুতগতি ও ভিক্টোরিয়ান ঘরোয়া জীবনের ধীরগতি। শিল্পকর্মে নারীসুলভতা নিয়ে দ্বিধা তুলে ধরেছেন, যেখানে নারীকে যৌন আবেদনময়ী কিন্তু নির্দোষ, অসুস্থ কিন্তু লাস্যময়ী এবং আধুনিক কিন্তু সময়হীন হিসেবে দেখানো হয়েছে। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত Seductive Surfaces: The Art of Tissot বইতে লেখক এডওয়ার্ড মেইডার উল্লেখ করেছেন, ‘পোশাকটিকে একটি ফ্যাশন বিবৃতি অথবা শোকের শেষ স্তর হিসেবে পড়া যেতে পারে। এখানে মহিলার গলায় পরা কালো ক্রস রিবন নেকলেস শোকের গহনা হিসেবে জুতসই।’
তিসো জন্মেছিলেন ১৮৩৬ সালে, মারা যান ১৯০২ সালে। ঔপনিবেশিক শাসন তখনো সম্প্রসারমাণ। তার ওপর তিনি বসবাস করতেন ব্রিটেনে। সে সময়ে ইউরোপের উচ্চবিত্ত নারীদের জীবন ও সমাজের নানা দিক এঁকেছেন তিনি। কেবল সাজপোশাক আর লালিত্যপূর্ণ অভিব্যক্তিই না; ফুটে উঠেছে তাদের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাও। দ্য কনভালেসেন্টের সঙ্গে তুলনীয় তার অন্য একটি চিত্রকর্মের নাম সানডে মর্নিং। ১৮৮৩ সালে আঁকা চিত্রকর্মটিতে এক নারীর হাতে একটা বাইবেল ধরে রাখা; তার পরনে আধুনিক ও আকর্ষণীয় পোশাক। তরুণীর দস্তানা পরা হাতে ধরে রাখা বাইবেল। এতটুকু স্পষ্ট যে তিনি গির্জায় যাচ্ছেন। তার দৃষ্টি চিন্তামগ্ন, তার কপাল কিছুটা কুঁচকানো। তার চেহারা উদ্বিগ্ন মনে হয়। ভিক্টোরীয় যুগের ধর্মীয় ও সামাজিক চিন্তাভাবনার দ্বন্দ্ব। তিসো নিখুঁতভাবে সেটা তুলে ধরেছেন। দ্য কনভালেসেন্টের মতো সানডে মর্নিংও তিসোর নামের পাশে দাঁড়িয়ে আছে সমকালের প্রতিনিধিত্বশীল সৃষ্টিকর্ম হিসেবে।










