বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ৩৭০টি জাদুঘরের পরিচালক, শিল্প সংগ্রাহক, পণ্ডিত ও শিল্পবোদ্ধারা ভিড় জমিয়েছেন দি ইউরোপিয়ান ফাইন আর্ট ফাউন্ডেশনের (তেফাফ) প্রদর্শনীতে। পুরনো ইউরোপীয় চিত্রকলা থেকে শুরু করে আধুনিক ও সমসাময়িক শিল্প, আলোকচিত্র, গহনা এবং বিশ শতকের নকশা—নেদারল্যান্ডসের দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহাসিক শহর মাস্ট্রিখটে হওয়া এ প্রদর্শনীতে এক ছাদের নিচে মিশে আছে সাত হাজার বছরের শিল্পের ইতিহাস।

তেফাফের এ অসাধারণ প্রদর্শনী শুরুর প্রথম ঘণ্টাতেই বিক্রির উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে সংগ্রাহকদের মধ্যে। এবারের আয়োজনে প্রাচীন ও ক্ল্যাসিক শিল্পকর্মগুলোর পাশে জায়গা পেয়েছে বিমূর্ত ও আধুনিক শিল্পের নিদর্শন। মূল প্রবেশদ্বারের ছাদ থেকে ঝুলে থাকা কাচে মোড়ানো হাজারো ফুল যেন শূন্যে ভাসমান। সব মিলিয়ে শিল্পপ্রেমীরা এখানে পাচ্ছেন মোহময় পরিবেশের আস্বাদ।

তিশিয়ানের হারিয়ে যাওয়া চিত্রকর্মের পুনর্জাগরণ

এবারের মেলায় পুরনো ইউরোপীয় শিল্পকর্মের এক অনন্য সংকলন সবার সামনে নিয়ে এসেছে ট্রিনিটি ফাইন আর্ট। তিজিয়ান ও গিরোলামো দন্তের আঁকা ‘দ্য ম্যাডোনা অ্যান্ড চাইল্ড উইথ সেন্ট ম্যারি ম্যাগদালেন’ (১৫৫৫-১৫৬০) চিত্রকর্মটি প্রথমবারের মতো প্রদর্শিত হয়েছে এবারের মেলায়। এর আগে ২০০ বছর কোনো সন্ধান ছিল না চিত্রকর্মটির। শেষবার ১৯৩৭ সালে এটি ক্রিস্টি’জের নিলামে দেখা গিয়েছিল। তবে এক্স-রে বিশ্লেষণে চিত্রকর্মটিতে দেখা গেছে বেশ কিছু পরিবর্তন—একটি জানালা ও সূর্যরশ্মির আভা মুছে ফেলা হয়েছে, যোগ করা হয়েছে প্রবালের হার। আর সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, পুরুষ ব্যক্তির মুখাবয়ব বদলে এতে ম্যারি ম্যাগদালেনের প্রতিকৃতি বসানো হয়েছে।

12

একই বুথে ছিল হেনড্রিক গোল্টজিয়াসের ‘জুপিটার অ্যান্ড জুনো’ (১৬১৬)। এতে হোমারের"ইলিয়াড থেকে নেয়া একটি দৃশ্য চিত্রিত হয়েছে। আর ছিল মিরাবেলো কাভালোড়ির"‘এলিগোরিক্যাল পোর্ট্রেট অব আ ইয়াং ম্যান’। এটি দেখে যে কেউ আধুনিক চিত্রকর্ম ভেবে ভুল করতে পারেন। কারণ ৪৫০ বছর পুরনো চিত্রটি আধুনিকতার সঙ্গে মিশে গেছে। শিল্পীর অ্যান্ড্রোজিনাস নান্দনিকতা ও সূক্ষ্ম অলংকরণ দেখে মনে হয়, এটি বর্তমান সময়ের কোনো কাজ।

প্রাচীন শিল্পের বিপরীতে মিনিমালিজমের স্পর্শ

লন্ডনের বেসরকারি বিক্রেতা পল কুলন তেফাফের ফোকাস সেকশনে এনেছেন ড্যান ফ্ল্যাভিনের ‘দ্য নমিনাল থ্রি (দ্য উইলিয়াম অব ওকম্যান)’ (১৯৬৩)। এর মাত্র তিনটি সংস্করণ রয়েছে। তাদের একটি গুগেনহাইম মিউজিয়ামে, অন্যটি দিয়া আর্ট ফাউন্ডেশনে আর তৃতীয়টি বহু দশক ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল।

জাপানি মিনিমালিজমের সূক্ষ্মতা

কিয়োটোর শিবুনকাকু গ্যালারি তাদের স্টলে এনেছে জাপানি মিনিমালিজমের সংমিশ্রণ। ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে টাকাওকার ধাতব শিল্পে প্রসিদ্ধ এ শিল্পী এতটাই সূক্ষ্ম ব্রোঞ্জ ঢালাই করেন, যা অন্য কারো পক্ষে হয়তো সম্ভবই না। গত বছর তেফাফের তৈরি শিল্পকর্মগুলো মুহূর্তেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। তাই গ্যালারি এবার পুরো বুথ উৎসর্গ করেছে তাকে। এবারো মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যেই বিক্রি হয়ে গেছে তার বেশকিছু শিল্পকর্ম।

যুদ্ধের প্রতীক ও রহস্যময় চিত্রকর্ম

আধুনিক ও পুরনো শিল্পের সংমিশ্রণের সবচেয়ে অদ্ভুত নিদর্শন ছিল ১৭ শতকের এক দ্বৈত চিত্রকর্ম। প্রথমে এটি ছিল আইজাক লুটিচুইসের আঁকা এক তরুণের প্রতিকৃতি। পরে এর ওপর লুডলফ ব্যাকহাউসেন ঝড়ের সমুদ্রদৃশ্য এঁকেছিলেন। সেখানে তরুণের মুখটি সমুদ্রের তরঙ্গের মাঝ থেকে উঠে আসে, যেন এক রহস্যময় আত্মা!

এছাড়া পিটার ফাইনারের প্রদর্শনীতে ছিল প্রাচীন যুদ্ধাস্ত্র ও সামুরাইদের মুখোশ। অষ্টাদশ শতাব্দীর পর্তুগিজ বুনো শূকরের মস্তকাকৃতির স্যুপ টেরিনও ছিল দর্শকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

সময়ের সেতুবন্ধ

এবারের তেফাফে অ্যান্ডি ওয়ারহলের উপস্থিতি ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তার জোসেফ বয়েস পোর্ট্রেট ছাড়াও ১৯৭৩ সালের চিত্রকর্ম মারেলা অ্যাগনেলি ও ১৯৬০-এর দশকের বিখ্যাত ফ্লাওয়ারস সিরিজের ছোট্ট দুটি চিত্রকর্মও দর্শকদের মন কেড়েছে।

তবে এবারো তেফাফের চেতনার প্রকৃত প্রতিফলন দেখা গেছে দান ভোর আনটাইটেলড (২০২৪) মিশ্রমাধ্যম ভাস্কর্যে। রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম-দ্বিতীয় শতকের মার্বেল ভাস্কর্যের টুকরোগুলো শিল্পীর তৈরি কাঠের কাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে এক নতুন রূপ পেয়েছে। মূলত বিভিন্ন যুগের সংমিশ্রণ বোঝাতেই শিল্পকর্মটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রদর্শনীর নাটকীয়তা

তেফাফের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রদর্শনী নকশার অভিনবত্ব। ১৬ শতকের বিজ্ঞানী ও সিরামিক শিল্পী বার্নার্ড প্যালিসির ঐতিহাসিক সিরামিক শিল্পকে সম্মান জানিয়ে এবার ব্রাসেলসের ফ্লোর গ্যালারি পুরো বুথকে একটি মস আচ্ছাদিত গুহায় পরিণত করেছে।

লিসবনের সাও রোক গ্যালারি তো মেলায় নিয়ে এসেছে একটি আস্ত অষ্টাদশ শতাব্দীর ছাদ। ছাদটি এক পুরনো প্রাসাদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

লন্ডনের ওয়েইস গ্যালারি প্রদর্শন করেছে জ্যাকোবিয়ান ও টিউডর আমলের অভিজাতদের প্রতিকৃতি। পিয়ের ডেলর্মের আঁকা লুই-ফিলিপ-জোসেফ দ’ওর্লেয়াঁর প্রতিকৃতি তার রাজনৈতিক জীবন ও বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

এছাড়া জন সাউচের আঁকা লেডি অ্যান ললির প্রতিকৃতি ছিল শিল্পমেলায় আভিজাত্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

অন্যদিকে প্যারিসের স্টেইনিজ্ট তো সম্পূর্ণ আলাদা একটি গ্যালারি বানিয়ে ফেলেছে, যার প্রবেশদ্বারে রয়েছে ১৮৩০ সালের ক্যারারা মার্বেলের বিশালাকার দুটি কানোপিক ফুলদানি। বুথের অভ্যন্তরে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন পারকেট ফ্লোর, কাঠের প্যানেলিং এবং ১৭ শতকের একটি ভেনেশিয়ান রক ক্রিস্টাল আয়না, যেন অতীতের কোনো রাজপ্রাসাদ উঠে এসেছে বর্তমানে। অতীত যুগের রাজপ্রাসাদে পরিণত করেছে।

তেফাফে বিক্রির জন্য যেকোনো শিল্পকর্মকে কঠোর বিশেষজ্ঞ প্যানেলের যাচাই পর্ব পেরোতে হয়। ২৮টি ক্যাটাগরির ১৮০ জন বিশেষজ্ঞ প্রতিটি শিল্পকর্মের সত্যতা নিশ্চিত করেন। ফলে এটি বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য শিল্প মেলাগুলোর মধ্যে একটি।

তথ্যসূত্র: আর্টনেট