‘সুফিয়া উইথ হার বার্ডস’-এ এক নারী ও পাখিদের মধ্যে জন্ম নিয়েছে এক নিঃশব্দ কোলাহল, যেন ভাষাহীন সংলাপের এক গোপন মহড়া। আর ‘স্টেরিং ওম্যান’-এ রঙ ও তুলির স্তরে স্তরে ভেসে উঠে এসেছে নারীর দৃষ্টি, সে দৃষ্টি কি নিছক প্রত্যাখ্যান, নাকি দীর্ঘদিন চেপে রাখা কোনো আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ, তা নির্ণয়ের ভার দর্শকের বিবেকের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন শিল্পী। এমনই অসংখ্য অব্যক্ত গল্প, অনুচ্চারিত অভিজ্ঞতা আর নীরব প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ও আবুল খায়ের সংগ্রহের যৌথ উদ্যোগে বেঙ্গল শিল্পালয়ের কামরুল হাসান এক্সিবিশন হলে আয়োজন করা হয়েছে চিত্রকর্ম প্রদর্শনী ‘দ্য আদার ভয়েস’।

দুই দশকের শুরুর দিকের ৩৭ জন নারী শিল্পীর নির্বাচিত চিত্রকর্মে সাজানো প্রদর্শনীটি কেবল একটি প্রদর্শন নয়, এটি এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের কালকে দৃশ্যমান করে তোলে। সে সময়ের পরিবর্তনশীল আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা শিল্পীদের ক্যানভাসে ধরা দিয়েছে নানা ভঙ্গিতে, কখনো প্রত্যক্ষ, কখনো প্রতীকী, কখনো আবার নিঃশব্দ অথচ গভীরভাবে স্পর্শকাতর। এ কাজগুলো একত্রে দাঁড়িয়ে জানান দিচ্ছে, নারীর অভিজ্ঞতা কখনোই একক বা সরল নয়, বরং তা বহুমাত্রিক, দ্বন্দ্বময় এবং সময়ের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

WhatsApp Image

শুধু নারী শিল্পীদের নিয়ে আয়োজিত প্রদর্শনী প্রায়ই লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনকে আরো দৃশ্যমান করে তোলার ঝুঁকি বহন করে। কিন্তু বাংলাদেশের শিল্পপরিসরে নারী সৃজনশীলদের দীর্ঘদিনের অদৃশ্যতা ও উপেক্ষার প্রেক্ষাপটে ‘দ্য আদার ভয়েস’ একটি প্রয়োজনীয় ও সময়োচিত হস্তক্ষেপ। এখানে সুপ্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের পাশাপাশি স্থান পেয়েছেন এমন অনেক শিল্পী, যাদের কাজ দীর্ঘদিন আলোচনার বাইরে থেকে গেছে। এ সমাবেশ এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ, সেই শিল্প-ইতিহাসের বিরুদ্ধে, যা যুগের পর যুগ পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় নারী শিল্পীদের প্রান্তিক করে রেখেছে।

প্রদর্শনীর সংগ্রহটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও চিন্তাশীলভাবে বিন্যস্ত। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কীভাবে এই শিল্পীরা নিজেদের ভাষা নির্মাণ করেছেন এবং বাংলাদেশের শিল্পকলার কারিগরি ও বিষয়ভিত্তিক বিবর্তনে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন অন্তরা আজাদ, আতিয়া ইসলাম এ্যনি, দিলারা বেগম জলি, ফাহমিদা কাকলি, নাজমুন নাহার কেয়া, মাকসুদা ইকবাল নিপা, নাঈমা হক, নাজমুল আকতারসহ আরও বহু চিত্রশিল্পী, যাদের কাজ একত্রে মিলিত হয়ে একটি বিকল্প শিল্প-ভাষার সম্ভাবনা উন্মোচন করেছে।

WhatsApp Image 2026-01-28 at 4.45.58 PM

‘দ্য আদার ভয়েস’-এর লক্ষ্য কেবল নারী শিল্পীদের উপস্থিতি নথিভুক্ত করা নয়। বরং শৈল্পিক শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করার যে মানদণ্ডগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত, তার ভেতরে প্রোথিত বৈষম্য ও পক্ষপাতকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানোই এই প্রদর্শনীর মূল অভিপ্রায়। যেহেতু এই শিল্পীদের নিয়ে এখনো খুব বেশি নিবিড় বা একক গবেষণা হয়নি, তাই এই প্রদর্শনী বিস্মৃতির অন্তরাল থেকে তাদের শিল্পকর্ম পুনরুদ্ধারের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠতে পারে। এটি এমন এক স্বীকৃতি, যা তাদের কাজের বহুবর্ণ ইতিহাস এবং তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকে নতুন করে মর্যাদা দেয়।

প্রদর্শনীটি চলবে আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। রবিবার ছাড়া প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।