বিশ্ব শিল্প পাঠে প্রায় সবসময়ই সমসাময়িক সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক এবং জীবনযাপনের ক্ষেত্রে জ্ঞানগত ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনগুলোর প্রতিফলন ঘটে দৃশ্যকলায়, ফলে শিল্প পায় নতুন মাত্রা। তাই বিশ্বজুড়ে একসময়ের নান্দনিক গুণের মানদণ্ডগুলো পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিকভাবেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। সময়ের বাস্তবতা আর অভিজ্ঞতার ভাঁজ উন্মোচনের মধ্য দিয়ে নতুন চিন্তার আবির্ভাব ঘটে আর এভাবেই দৃশ্যকলা তার নতুন মাত্রা নিয়ে বিকশিত হয়। প্রায় সূচনালগ্ন থেকে শিল্পকর্মের স্থায়িত্ব এবং এর সংগ্রহযোগ্যতাকে নিয়ে নানারূপ চর্চা হয়ে আসছে। উত্তরাধিকার থেকে প্রাপ্ত ধারণার প্রচেষ্টাকে আমরা আমাদের দেশে আজকের সময়েও দৃশ্য শিল্প বিচারের একমাত্র মানদণ্ড বা সারবস্তুর কিংবা গুণ হিসেবে গণ্য করে আমাদের শৈল্পিক অনুশীলনে সেগুলোকে আঁকড়ে ধরে আছি। অথচ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাপী সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং জীবনযাপনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত, চিন্তাগত সর্বোপরি জ্ঞানগত ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলো আমাদের চর্চায় প্রায় উপেক্ষিত থেকে গেছে। বিংশ শতাব্দীতে দেখতে পাব পুঁজিবাদী অর্থনীতির উত্তরণের ফলে শিল্পকর্মকে পণ্যের মতো বা বাণিজ্যিক বস্তু হিসেবে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যকে শিল্পীরা অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করেছেন। অনিবার্যভাবে তখন থেকেই দৃশ্য শিল্পে এ আদর্শবাদী ও টেলিওলজিক্যাল সংস্করণের মৃত্যু ঘটেছে। স্থায়িত্ববোধের ধারণাকে শিল্পীরা নানাভাবে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নানা স্থানে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক অনুশীলনে শিল্পের এ টেম্পোরালিটি বা অস্থায়ী প্রকৃতির ধারণার চর্চা ছিল। আমাদের দেশে লৌকিক আচার ও লোকশিল্প রচনার ভেতর টেম্পোরালিটি বা অস্থায়িত্বের ধারণাটির প্রায়োগিক রূপ অত্যন্ত গভীরভাবে প্রোথিত। এখানে সরাসরি বিভিন্ন উৎসবে শিল্পবস্তু তৈরি করা হয়; বিয়ে, নবান্ন, পূজা বা অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় আলপনা, সাময়িক তোরণ ও মণ্ডপ এবং আচারভিত্তিক মাটির সামগ্রী ইত্যাদি। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সেগুলোর আর প্রয়োজন হয় না। বস্তুত এখানে শিল্পকে জীবনের প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো চিরস্থায়ী সত্তা হিসেবে দেখা হয়নি কখনই; বরং শিল্প এখানে জীবনেরই অংশ, সময় ও প্রকৃতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হিসেবে দেখা হয়। যা-ই হোক, টেম্পোরালিটি বা অস্থায়ী শিল্প বলতে এমন শিল্পকর্ম বোঝায় যেগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে সীমিত সময়ের জন্য তৈরি করা হয়। ফলে শিল্পের এ টেম্পোরালিটি মূলত সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা সময়ের অধীনতাকে নির্দেশ করে। তাই বাংলায় একে কালিকতা, সময়গততা বা অস্থায়ী প্রকৃতি বলা যেতে পারে।

সমসাময়িক সময়ে আমাদের দেশের শিল্পচর্চার মূল ধারার স্রোতে বিচ্ছিন্নভাবে টেম্পোরালিটি বা কালিকতার চর্চা থাকলেও প্রায়ই প্রশ্ন উত্থাপন হয় ‘মাধ্যমটি কতকাল স্থায়ী থাকবে’, যেন স্থায়িত্বই শিল্পকর্মের শেষ আদর্শিক গুণ। অথচ আমরা দেখব ১৯৬০ ও ১৯৭০ সালের দিকে মূলত শিল্পকর্মকে পণ্যীকরণের ধারণা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্যই পাশ্চাত্যে টেম্পোরারি আর্ট বা অস্থায়ী শিল্পের ধারণাটির জন্ম হয়। আর তারই সূত্র ধরে পারফরম্যান্স আর্ট, স্থাপনা (Installation), ল্যান্ড আর্টসহ বহুবিধ জনরাগুলোর আবির্ভাব ঘটে।
পারফরম্যান্স আর্টে আমরা দেখি শিল্পীর শরীরকে ক্ষণস্থায়ীভাবে শিল্পবস্তু হিসেবে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া। ল্যান্ড আর্ট হিসেবে শিল্পী রবার্ট স্মিথসনের স্পাইরাল জেটি শিল্পকর্মটি টেম্পোরারি আর্টের একটি বিশেষ উদাহরণ। এটি একটি বৃহৎ আকারের শিল্পকর্ম, যা মাটি ও নানা প্রাকৃতিক উপকরণ থেকে তৈরি এবং পরিবেশগত কারণে এটি পরিবর্তনশীল, কখনো কখনো, এটি দীর্ঘ সময় ধরে সম্পূর্ণরূপে পানির নিচে ডুবে থাকে, অন্য সময়ে, এটি সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত এবং লবণ স্ফটিক দ্বারা আবৃত থাকে। প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলো ক্রমাগত এর রূপ পরিবর্তন করে এবং শিল্পকর্মটিকে ক্ষয় করে। নতুন প্রেক্ষাপটে শিল্পচর্চার অগ্রগামিতার জন্য অতীত অভিজ্ঞতার ধারণাগুলোকে আজকের শিল্পীরা চ্যালেঞ্জ করেন এবং নতুন অজানা যাত্রায় পা বাড়ান। শিল্পবোধের বিতর্ক নিরসনে এবং শিল্পের ভাষাকে নতুন নতুন মাত্রা প্রদানের শিল্প আলোচনার এ পর্বে আমরা দেখব ২০০৭ সালের প্রদর্শিত, উপস্থাপনাসংক্রান্ত পরিকল্পনাগত টেম্পোরালিটি-নির্ভর এক অপূর্ব শিল্পকর্মের অভিযাত্রা।

ফ্রান্সের পশ্চিম উপকূলের সেন্ট-নাজাইর শহরের লোয়ার নদীতে অবিরাম জলরাশির ওপর অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে ৪০ মাইল বিস্তৃত এলাকায় বাতাসের ধীরগতিতে ভেসে বয়ে চলা অদ্ভুত এক শিল্পকর্ম ‘রাবার ডাক’। বাংলায় যাকে বলা যেতে পারে রাবারের তৈরি হাঁস। শিশু খেলনার মতো দেখতে হলুদ রঙের অদ্ভুত বিশাল আকারের এই হাঁস মূলত ইনস্টলেশন ঘরানার একটি শিল্পকর্ম, রচয়িতা ডাচ শিল্পী ফ্লোরেন্টিন হফম্যান, যিনি তার বৃহৎ আকারের পাবলিক আর্টের জন্য ইদানীং বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এখন পর্যন্ত ফ্লোরেন্টিন হফম্যানের তৈরি সবচেয়ে বৃহদাকৃতির রাবার ডাক প্রদর্শনী এটিই, উচ্চতায় ২৬ মিটার, প্রস্থে ২০ মিটার ও দৈর্ঘ্যে ৩২ মিটার (৮৫ ফুট × ৬৬ ফুট × ১০৫ ফুট)। পরবর্তী সময়ে ভিন্ন আকৃতিতে রাবার ডাক হংকং, সিডনি, বেইজিং, পিটসবার্গ, অকল্যান্ড, সাও পাওলো, ওসাকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে প্রদর্শিত হয়। প্রকৃতপক্ষে ২০১৩ সালে হংকংয়ে পৌঁছার আগে ‘রাবার ডাক’ চারটি মহাদেশের ১২টি স্থানে প্রদর্শিত হয়। বলা হয় ২০১৩-১৪ সালের মধ্যে রাবার ডাকটি ৩৫ মিলিয়নেরও বেশি দর্শকের সামনে প্রদর্শিত হয়েছে। অর্থাৎ বিশাল হলুদ স্ফীত হাঁসটি আজ পর্যন্ত হফম্যানের স্থাপনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দর্শকনন্দিত উল্লেখযোগ্য একটি কাজ। বলা হয় এ রাবার ডাকই হাফম্যানের সিগনেচার ওয়ার্ক বা শিল্পীর স্বাক্ষর বহনকারী শিল্পকর্ম।
দৈনন্দিন জিনিসপত্রকে শিল্প রচনার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হফম্যানের শিল্পকর্ম রচনার একটি বৈশিষ্ট্য। এর একটি চমৎকার উদাহরণ হলো ‘ফ্যাট মাঙ্কি’। ২০১০ সালে সাও পাওলোতে রচিত ফ্যাট মাঙ্কি কাজটিতে শিল্পী উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন ১০ হাজার উজ্জ্বল রঙের সৈকতে ব্যবহৃত স্যান্ডেল। তাছাড়া ২০১৪ সালে তাইওয়ানে স্থাপন করেন ‘মুন র্যাবিট’ নামে তার আরেকটি শিল্পকর্ম। আমরা দেখি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা একটি বিশাল খরগোশ রচনায় তিনি হালকা জলরোধী কাগজ ব্যবহার করেছিলেন। রাবার ডাক তৈরিতে তিনি ব্যবহার করেছিলেন ৪৯ হাজার প্লাস্টিকের ব্যাগ। ফ্লোরেন্টিন হফম্যানের এ পাবলিক আর্টগুলো মূলত সাইট স্পেসিফিক ইনস্টলেশন, যার অর্থ হলো শিল্পকর্মটি তার আশপাশের অবস্থানের সঙ্গে নানা মাত্রায় আন্তঃসম্পর্কে প্রতিস্থাপিত। আরেকটু গুছিয়ে বললে বলা যায়, এখানে স্থাপনা বা ইনস্টলেশন রচনায় শিল্পী কেবল দৃশ্যত আকর্ষণীয় শিল্পকর্ম রচনায় খান্ত নন; বরং শিল্পকর্ম রচনা অঞ্চলের অবস্থানগত নানা সম্প্রদায়, ইতিহাস, সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, পরিবেশের পরিস্থিতি কিংবা ভূদৃশ্যের সঙ্গে শিল্পকর্মের উপস্থাপনাসংক্রান্ত বিষয়বস্তুগুলোর সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টা করেন। বহু আগে থেকেই জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার তার ‘বিয়িং অ্যান্ড টাইম’ গ্রন্থে এ ধারণার ইঙ্গিত দেন, মানুষের অস্তিত্ব যেমন তার পরিবেশ ও প্রেক্ষাপটের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। তেমনি অস্থায়ী শিল্প প্রায়ই স্থান-নির্দিষ্ট, একটি নির্দিষ্ট স্থান এবং বিদ্যমান সময় ও শিল্পকর্মের আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে নানা মাত্রায় মিথস্ক্রিয়া করে। ফলে শিল্পকর্মটি স্থান থেকে সামান্য স্থানান্তরিত হলে শিল্পকর্মের মূল তাৎপর্য হারিয়ে যায়। তাই শিল্পকর্মের অবস্থানের সঙ্গে একটি অন্তর্নিহিত সম্পর্কের দ্বারা সাইট স্পেসিফিক ইনস্টলেশনের জনরাকে আলাদা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০১১ সালে আমস্টারডামে রচিত ‘স্টিলম্যান’ স্থাপনাটি অথবা লন্ডনে ২০১৪ সালে ‘হিপ্পোপোথেমস’ স্থাপনাটি ফ্লোরেন্টিন হফম্যানের উল্লেখযোগ্য সাইট স্পেসিফিক ইনস্টলেশনের প্রকৃত উদাহরণ। আমরা দেখব এখানে শিল্পী শিল্পরূপের সঙ্গে স্থানের ভারসাম্যকে সুন্দরভাবে বজায় রেখেছেন। অর্থাৎ হফম্যান তার কাজে জোর দিয়েছিলেন যাতে রূপ স্থানের কারণে এবং স্থান রূপের কারণে কোনোভাবেই যেন মলিন না হয়ে যায়। ফরাসি কিউরেটর, শিল্প সমালোচক ও তাত্ত্বিক নিকোলাস বুরিউড কর্তৃক প্রণীত ‘রিলেশনাল অ্যাস্থেটিকস’ তত্ত্বটিতেও আমরা দেখব শিল্পের সামাজিক ও আন্তঃসম্পর্কের দিকগুলোর ওপর শিল্পতাত্ত্বিক আলোকপাত করেছেন। বুরিউডের আলোচনায় একই সঙ্গে উঠে এসেছে টেম্পোরারি আর্টের প্রসঙ্গ। তিনি ইঙ্গিত করেছেন টেম্পোরারি আর্টে প্রায়ই দর্শকদের অংশগ্রহণকে শিল্পের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে এমন অভিজ্ঞতা তৈরি করে, যা সহজাতভাবে ক্ষণস্থায়ী। ফলে শিল্পের সামাজিক বন্ধন ও ইন্টারেক্টিভ মাত্রাগুলোর ওপর বুরিউড বেশি জোর দিয়েছেন। শিল্পকর্ম কোনো স্থির বস্তু নয়; বরং একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। তাই শিল্পকর্ম দর্শককে একটি অনন্য অপূরণীয় মুহূর্তের সঙ্গে জড়িত করে। আর তখনই রাবার ডাক শক্তিশালী রিলেশনাল অ্যাস্থেটিকসের প্রতীকী রূপ হয়ে ওঠে।
(চলবে)










