কথিত আছে, প্রাসাদের বিপুল ঐশ্বর্য ত্যাগ করে শাক্য রাজবংশের রাজপুত্র সিদ্ধার্থ কোনো এক রাতে ঘুমন্ত স্ত্রী, পুত্র, পরিবারকে নিঃশব্দ বিদায় জানিয়ে প্রিয় ঘোড়া কন্থককে নিয়ে প্রাসাদ ত্যাগ করেন। প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে বনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে রাজবস্ত্র ত্যাগ করে তলোয়ার দিয়ে তার লম্বা চুল কেটে মুণ্ডিতমস্তক হন। তারপর নিমজ্জিত হন ধ্যানের সাগরে। বোধি লাভ করেন কয়েক বছরের মধ্যে।

রাজপুত্র সিদ্ধার্থ গৌতমই পরবর্তী সময় ‘গৌতম বুদ্ধ’ নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হন। ‘বুদ্ধ’ শব্দের অর্থ পরম জ্ঞানী, যিনি জীবনের সত্যকে উপলব্ধি করে মানব জাতির কল্যাণে তার জ্ঞান প্রচার করেন। গৌতম বুদ্ধের মূল জীবনদর্শন ছিল অহিংসা, সাম্য, মৈত্রী ও প্রীতি।

পৃথিবীতে যখনই বেড়েছে হানাহানি, যুদ্ধ তখনই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে গৌতম বুদ্ধ ও তার জীবনদর্শন। গৌতম বুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতাকে প্রকাশ করতে যুগে যুগে বুদ্ধের আধ্যাত্মিক গভীরতাকে অনুভব ও উদযাপন করেছেন শিল্পীরা। সম্প্রতি এমনই এক উদযাপনের অংশীদার হয়েছে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা। বুদ্ধপূর্ণিমা উপলক্ষে প্রাচ্য-চিত্রকলা অনুশীলন সংঘ ও লার্নিং ডিজাইন স্টুডিওর ‘পবিত্র শান্তির জাগরণ: বাংলার বুদ্ধ’ প্রদর্শনী আয়োজনে সহযোগিতা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

5

গৌতম বুদ্ধের জীবন, দর্শন ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের চিরন্তন ভাবনাগুলো প্রাচ্য-শৈলীতে প্রকাশিত হয়েছে ‘পবিত্র শান্তির জাগরণ: বাংলার বুদ্ধ’ প্রদর্শনীতে। এতে অংশ নিয়েছেন ৭৩ জন বাংলাদেশী শিল্পী। বৈচিত্র্যময় মাধ্যমে নানা অনুষঙ্গ ব্যবহারে শতাধিক শিল্পকর্ম উপস্থাপন করেছেন শিল্পীরা।

বিশেষভাবে চোখে পড়ে মাটির তৈরি বুদ্ধের ভাস্কর্যটি। সাধারণত গৌতম বুদ্ধকে যে ধ্যানস্থ বসার ভঙ্গিতে দেখা যায়, এটি তেমন নয়। মাথা কাত করে এক পাশে হাতের দিকে এলিয়ে দেয়া। যেন বিরামহীন যুদ্ধবাজি ও হানাহানিতে ক্লান্ত ভীষণ বুদ্ধ!

ভাস্কর মানবেন্দ্র ঘোষের চোখে এভাবেই ধরা দিয়েছেন মহামতি বুদ্ধ।

প্রদর্শনীতে চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য, সিরামিকসহ রয়েছে বিভিন্ন মাধ্যমের কাজ। সেসব কাজে সংমিশ্রণ ঘটেছে ঐতিহ্যবাহী কৌশল ও সমসাময়িক শৈল্পিক ভাষার। শিল্পীরা ব্যবহার করেছেন তেলরঙ, জলরঙ, গোয়াশ, ওয়াশ, এগ টেম্পেরা, রিভার্স পেইন্টিং, বাটিক, চারকোল, কলম, অ্যালকোহল বেজড কালির কাজ।

নিজের শিল্পকর্মে এমনকি অগ্নিদগ্ধ বঙ্গবাজারের ছাই ব্যবহার করেছেন শিল্পী মোহাম্মদ আসাদ। বাংলায় বুদ্ধ (Buddha in Bengal) শিরোনামের এ কাজে পুড়ে যাওয়া কাপড়ের ছাই ব্যবহৃত হয়েছে রূপান্তর ও পুনর্জন্মের প্রতীক হিসেবে।

শিল্পী মুস্তাকিম বিল্লাহ তানজিম বুদ্ধকে প্রকাশ করেছেন তালপাতার মাধ্যম ব্যবহার করে। ঐতিহ্য ও বাঙালিয়ানার এ মিশেল বাংলা ভাষীদের কাছে যেন আরো আপন করে তুলেছে বুদ্ধের জীবনদর্শনকে। এছাড়া প্রদর্শনীতে রয়েছে রিকশাচিত্র, সিনেমার ব্যানার চিত্র, ক্যালিগ্রাফি, সুই-সুতার কাজ ইত্যাদি।

6

প্রদর্শনীতে নজর কেড়েছে মিক্সড মিডিয়ামে তৈরি বুদ্ধের একটি শিল্পকর্ম। ‘বুদ্ধদেব’ শিরোনামের এ শিল্পকর্মের শিল্পী দেবাশীষ বিশ্বাস। এমব্রয়ডারিসহ ব্যবহৃত প্রতিটি মিডিয়ামের নিখুঁত মিশ্রণে এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে বুদ্ধের জীবনদর্শনের প্রাসঙ্গিকতা।

বর্তমান অস্থির বিশ্বে মানুষ যে দুদণ্ড শান্তি খুঁজে বেড়ায় সেটিও উপলব্ধি করা যায় ‘পবিত্র শান্তির জাগরণ: বাংলার বুদ্ধ’ প্রদর্শনীতে। কারণ প্রতিদিন দর্শকের পদচারণে মুখর হয়ে উঠছে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের গ্যালারি। অহিংসা পরমধর্ম—বুদ্ধের এ বাণীকে ধারণ করেই যেন দর্শকের ঢল নামছে প্রদর্শনীতে। অস্থির সময়ে তৈরি এ শিল্পকর্মগুলোয় গৌতম বুদ্ধের শান্ত-শীতল অবয়ব ছুঁয়ে দিচ্ছে দর্শকদের অন্তর্দৃষ্টি।

এছাড়া শিল্পকর্মের বৈচিত্র্য আকর্ষণ করেছে দর্শকদের। ঐতিহ্য ও সমসাময়িক উপকরণের মিশেল প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলোকে বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। প্রদর্শনীর কিছু শিল্পকর্মে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এগ টেম্পেরার মতো প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী উপকরণও।

‘বাংলার বুদ্ধ’ প্রদর্শনীর যে বিষয়টি উল্লেখ না করলেই নয় তা হলো এর সামগ্রিকতা। নানা আঙ্গিকে, নানা মোটিফে এতে বুদ্ধ তথা তার জীবনদর্শনকে প্রাসঙ্গিক করে তোলা হয়েছে। এখানে যেমন প্রাচীন এগ টেম্পেরা মিডিয়াম ব্যবহৃত হয়েছে, তেমন ব্যবহৃত হয়েছে সম্প্রতি আগুনে পোড়া বঙ্গবাজারের ছাই। পুরনো ও নতুনের এমন যোগাযোগে বুদ্ধকে তুলে ধরার প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

৭৩ জন শিল্পীর দেশীয় শিল্পীর আঁকা শতাধিক চিত্রকর্মের পাশাপাশি ‘পবিত্র শান্তির জাগরণ: বাংলার বুদ্ধ’ শিরোনামের আয়োজনে থাকছে সেমিনার, শিল্পালোচনা, পুঁথিপাঠ, চর্যাগান ও নৃত্য-সংগীতায়োজন। রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডিতে অবস্থিত আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে লা গ্যালারিতে ৯ মে শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী চলবে ১৬ মে পর্যন্ত। গৌতম বুদ্ধের জীবন ও দর্শনের এ শিল্পকর্ম প্রদর্শনী বিশ্বে শান্তি সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির আশা জাগাবে বলে বিশ্বাস করেন আয়োজকরা।