বাংলার শিল্প ঐতিহ্য হাজার বছরের। গৌতম বুদ্ধ জীবিত থাকার সময়েও চিত্রকর্মের চর্চা এ অঞ্চলে ছিল বলে নিদর্শন পাওয়া গেছে। পাল আমল ছিল পুথিচিত্রের স্বর্ণযুগ। বাংলায় সুলতানি যুগের সূচনা ঘটলে স্থানীয় চিত্রকলায় পারসিক স্রোত যুক্ত হয়। এভাবে ভিন্ন স্রোত ও প্রবণতার যে যুক্ত প্রবাহ বাংলাকে সমৃদ্ধ করে রেখেছিল; মোগল শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে সে সিলসিলা আরো দীর্ঘ হয়। বাংলার নওয়াবি আমল বলতে সাধারণত আঠারো শতকের মুর্শিদাবাদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শিল্পপ্রবণতাকে বোঝানো হয়। ততদিনে মোগল শাসন ক্ষয়িষ্ণু রূপ নিয়েছে। কিন্তু মুর্শিদাবাদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা চিত্রকলা তখন ঊর্ধ্বমুখী। অবশ্য এর পেছনেও যথেষ্ট কারণ ছিল। ঢাকা থেকে রাজধানী স্থানান্তরের পর মুর্শিদাবাদই বাংলার কেন্দ্রে পরিণত হয়। তাছাড়া হোসেন শাহ ও বিশেষ করে নুসরত শাহের আমলে চিত্রকলার বিকাশও ঘটে এ অঞ্চলে। ফলে সেই সূত্র এখানে চিত্রকলাকে নতুনভাবে মাথা উঁচু করতে শক্তি জুগিয়েছে। মোগল সাম্রাজ্যের ক্ষয়িষ্ণু সময়ে দিল্লি থেকে বহু চিত্রশিল্পী বাংলার পথে রওনা হন। তাদের হতাশ করেননি এখানকার শাসকগোষ্ঠী। প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্পকলার যে ধারা এখানে এগিয়ে যায়, তা তুলনামূলকভাবে ক্ষণস্থায়ী হলেও স্বতন্ত্র। ইউরোপীয় আধুনিকায়নের আগ পর্যন্ত মুর্শিদাবাদ গর্বের সঙ্গেই সে স্বাতন্ত্র্য ধরে রেখেছিল।

15

বাংলার প্রথম নওয়াব মুর্শিদ কুলি খান। তার সময়কার কয়েকটি চিত্রকলা পাওয়া যায় এখনো। তা থেকে সহজেই অনুমিত হয়, তিনি শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ভাগীরথী নদীর তীরে মুর্শিদ কুলি খানের দরবার অনুষ্ঠান, মহররম মিছিল, খাজা খিজিরের উৎসব চিত্রকর্ম লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে। অংকন পদ্ধতিতে মোগল শিল্পকলার প্রভাব বিদ্যমান এসব চিত্রকর্মে। সম্ভবত চিত্রকররা মোগল দরবার থেকে আসা কিংবা অন্তত মোগল দরবারের চিত্রশিল্পীদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। মুর্শিদ কুলি খানের পর সবচেয়ে বড় নাম আসে আলীবর্দী খানের। ইতিহাস থেকেই প্রমাণিত যে আলীবর্দী খান কেবল সফল শাসক নন; শিল্প ও সংস্কৃতির দিক থেকেও একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তার দরবারেরও বেশকিছু চিত্রকর্ম পাওয়া যায়। সেগুলোর মধ্যে হরিণ শিকারে মগ্ন নওয়াব আলীবর্দী খান এবং বাগান চত্বরে ভ্রাতুষ্পুত্রদের সঙ্গে আলাপরত নওয়াব আলীবর্দী খানের চিত্রকর্ম দুটি বর্তমানে ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে আছে। রঙের ব্যবহার ও তুলির আঁচড় বিবেচনা করলে চিত্রকর্ম দুটি মুর্শিদাবাদ ঘরানার শিল্পকলার নিজস্ব স্বাক্ষর বহন করছে। আলীবর্দী খানের শিকার করার চিত্রকর্মটিতে রঙের ব্যবহার কিছুটা হালকা। লাল কিংবা নীল নয়; এক্ষেত্রে প্রাধান্য দেখা যায় উজ্জ্বল সাদা ও ধূসর রঙের। নওয়াবি আমলের স্বতন্ত্র এ ধারা ও প্রবণতা সম্প্রসারিত হয় সিরাজউদ্দৌলার আমলে। মূলত সিরাজের উদার মনোভাবের কারণে মুর্শিদাবাদ দরবারের চিত্রকলা আরো সমৃদ্ধ হয়। দরবারের শোভা বর্ধন করতে থাকেন পারস্য ও দিল্লি থেকে আসা শিল্পীরা। এ সময়ের চিত্রকলাও কিছুটা দরবার ও কথোপকথন দৃশ্য থেকে মুক্তি লাভ করে বলে মনে হয়। বরং চিত্রকররা অন্দরমহল ও রাগমালার দৃশ্য অঙ্কন করতে উৎসাহিত হয়ে ওঠেন। ফলে এ সময়ে চিত্রকলার পরিধিও অনেকটা অনুভূতিপ্রবণ হতে শুরু করে। দরবারের শিল্পীরা রাগ-রাগিণীর দৃশ্য অঙ্কন করেছেন। প্রণয় কিংবা প্রাকৃতিক দৃশ্য; দরবার চত্বর অথবা নদী ভ্রমণে নর-নারীর অন্তরঙ্গ দৃশ্য এ যুগে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। বিষয়টি তখনকার ছবির অ্যালবাম ও মিনিয়েচার চিত্রকলার মধ্যেই স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

16

মুর্শিদাবাদের চিত্রকররা হাতে তৈরি কাগজে জলরঙ ব্যবহার করে চিত্রাঙ্কন করতেন। কতেকটা ব্যতিক্রমের কথা বাদ দিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অঙ্কনের কাজ এগিয়ে যেত মোগল শিল্পরীতি অনুসারে। দিগন্তে অর্ধবৃত্তাকার ঝোপের সারি, নদীতীরে সারস পাখির দল, তরঙ্গায়িত টিলার মাঝে অর্ধবৃত্তাকার গুল্ম মুর্শিদাবাদ শিল্পরীতির পরিচয় বহন করে। সিরাজের পর মীর জাফরের আমলে (১৭৫৭-৬০) অঙ্কন রীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। যেহেতু সময়টি ছিল রাজনৈতিকভাবে উত্তাল। ফলে সিরাজউদ্দৌলার আমলের সজীবতা ও সৌন্দর্য অনেকাংশে হ্রাস পেতে থাকে। পলাশীর যুদ্ধের পর থেকেই রাজনৈতিক পতনের সমান্তরালে সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ও দৃশ্যমান হতে থাকে। রঙের মাত্রা কমে যেতে থাকে। আর রঙের ব্যবহার কমে যাওয়ার মানে দরবারের অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কমে যাওয়া। তবে এ সময়ে লক্ষ্ণৌর প্রসিদ্ধ চিত্রকর পুরাননাথ মুর্শিদাবাদ চিত্রশালায় যোগ দেন। তিনি এক বিশাল মাঠে নওয়াব মীরজাফর ও তার পুত্র মিরনের সৈন্যবাহিনী পরিদর্শনের চিত্র অঙ্কন করেন। অপরাপর মিনিয়েচার চিত্রগুলোয় স্বাভাবিক উপবেশনে নওয়াবের একক চিত্র ও আনুষ্ঠানিক দরবার চিত্র দেখা যায়। বিষয়বস্তু এবং রঙ বিন্যাসের ক্ষেত্রে সদৃশতার বিচারে চিত্রকলাগুলো আলীবর্দী খানের চিত্রকলার কথা মনে করিয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে মীর জাফরের প্রতিকৃতি অঙ্কনে আলীবর্দী খানের প্রতিকৃতির অনুসরণ করা হয়েছে।

মীরজাফরের সময়ে লক্ষ্ণৌর যেসব চিত্রকর রাজকীয় চিত্রশালায় নিয়োজিত ছিলেন, তারা মীর কাশিমের চিত্রশালায়ও কাজ করেন। তাদের মধ্যে প্রখ্যাত চিত্রকর দীপচাঁদের দক্ষ হাতে অঙ্কিত হয় মীর কাশিমের অন্যতম সভাসদ গুরগানের প্রসিদ্ধ প্রতিকৃতি। এ সময়ে অঙ্কিত নওয়াবদের আনুষ্ঠানিক দরবার চিত্রগুলো পূর্ববর্তী শাসন আমলের চিত্রকর্মের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়। মীর কাশিমের সময়ে লক্ষ্ণৌর চিত্রকরদের আগমন ও প্রাধান্যের কারণে মুর্শিদাবাদ চিত্রকলার রীতিতে লক্ষণীয় পরিবর্তন সূচিত হয় এবং মোগল চিত্রকলার প্রচলিত রীতির পরিবর্তে লক্ষ্ণৌ চিত্রকলার নতুন রীতি স্থান লাভ করে।

ইংরেজদের হাতে মীর কাশিমের পরাজয় ও ক্ষমতাচ্যুতি এবং বৃদ্ধ নওয়াব মীরজাফরের দ্বিতীয়বার মুর্শিদাবাদের মসনদে অধিষ্ঠিত হওয়ার কারণে শিল্প ও সংস্কৃতি বিকাশের পথ বাধাগ্রস্ত হয়। মুর্শিদাবাদ চিত্রকলা পৃষ্ঠপোষকতার ভার তখন মুর্শিদাবাদের ধনাঢ্য জমিদার, সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার, হিন্দু ও জৈন-ব্যবসায়ী এবং ইংরেজ কর্মকর্তাদের ওপর ন্যস্ত হয়। তারা বিপর্যস্ত চিত্রকরদের হিন্দু-মুসলমানের পাণ্ডুলিপি ও ছবির অ্যালবামগুলো চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করার কাজে নিযুক্ত করেন। পাণ্ডুলিপি ও অ্যালবামের মধ্যে ‘দস্তুর-ই-হিমায়াত’, ‘রজমনামা’, ‘নল-দময়ন্তী’, ‘নবব দমন’ ও ‘রাগমালা’ ছিল উল্লেখযোগ্য। চিত্র অঙ্কনে চিত্রশিল্পীরা বিশ্বস্ততার সঙ্গে বাংলার উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের ছবি অতিসাধারণভাবে অঙ্কন করেছেন। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ পতনোন্মুখ মুর্শিদাবাদ চিত্রকলা রীতির শেষ চিহ্নের ওপর আঘাত হানে। দুর্ভিক্ষ প্রপীড়িত চিত্রকররা ব্রিটিশ প্রভুদের চিত্র কর্মশালায় আশ্রয় গ্রহণ করে সমসাময়িক ইউরোপীয় শিল্পকলার ভাবধারায় প্রভাবিত কোম্পানি শিল্পকলা রীতি গ্রহণ করে।