জয়নুল গ্যালারির দেয়ালে ঝোলানো বিশাল ক্যানভাস। নেই কোনো মানুষের মুখ, নেই নদী-পাহাড়ের দৃশ্য, নেই কোনো শহর বা গ্রামের পরিচিত চিত্র। আছে শুধু রঙের স্তর, কিছু রেখা, কয়েকটি আকৃতি আর ক্যানভাসজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক ধরনের অদ্ভুত ভারসাম্য। ছবিটির সামনে দাঁড়িয়ে একজন দর্শক কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বললেন, ‘এটা কী, এটাকে আবার ছবি বলে? এসব তো আমিও আঁকতে পারি।’
আরেকজন দাঁড়িয়ে রইলেন। এক মিনিট, দুই মিনিট। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘জানি না শিল্পী কী বলতে চেয়েছেন। তবে ছবিটা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলছে।’
এখানে দুই দর্শকের প্রতিক্রিয়াই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিমূর্ত শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি বিতর্ক। এসব চিত্রকর্ম দেখলেই অনেকের মনে প্রথম একটি প্রশ্ন আসে—এটা কি সত্যিই শিল্প?
প্রশ্নটি শুনতে সরল হলেও এর উত্তর সরল নয়। কারণ শিল্প বলতে আমরা কী বুঝি, সে সংজ্ঞার ওপরই অনেকটা নির্ভর করে উত্তরটি। যদি শিল্পের অর্থ হয় বাস্তব পৃথিবীর কোনো দৃশ্যকে যতটা সম্ভব নিখুঁতভাবে ক্যানভাসে তুলে ধরা, তাহলে বিমূর্ত শিল্প নিঃসন্দেহে সে সংজ্ঞার বাইরে। কিন্তু শিল্প যদি মানুষের অনুভূতি, চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাকে অন্যভাবে দেখার একটি মাধ্যম হয়, তাহলে বিমূর্ততার জন্য সেখানে যথেষ্ট জায়গা রয়েছে। আর এ জায়গাটিই তৈরি করতে বিমূর্ত শিল্পকে বহু বছরের বিতর্ক, সমালোচনা ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

বিমূর্ত শিল্প বাস্তবতাকে হুবহু অনুকরণ করতে চায় না। বরং রঙ, রেখা, আকৃতি, বিন্যাস ও আকারের মাধ্যমে কোনো অনুভূতি, ধারণা বা অভিজ্ঞতাকে প্রকাশের চেষ্টা করে। অর্থাৎ এখানে ছবিটি কী দেখাচ্ছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে ছবিটি দর্শকের মনে কী অনুভূতি তৈরি করছে।
বিমূর্ত শিল্প নিয়ে সবচেয়ে পরিচিত মন্তব্য সম্ভবত ‘এটা তো আমার ছোট শিশুও আঁকতে পারে’। ক্যানভাসে কিছু রঙের ছোপ, এলোমেলো রেখা, বৃত্ত কিংবা চৌকো আকৃতি দেখে এমন মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বাস্তবধর্মী একটি প্রতিকৃতি আঁকতে শিল্পীকে মানুষের শরীরের গঠন, আলো-ছায়া, অনুপাত, রঙ ও অভিব্যক্তি সম্পর্কে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করতে হয়। সেখানে একটি বিমূর্ত ছবিতে তো সেসবের অনেক কিছুই দেখা যায় না।
তাই অনেক দর্শকের ধারণা, শিল্পী ইচ্ছা করেই কিছু রঙ ছুড়ে, কয়েকটি রেখা টেনে বা আকৃতি বসিয়ে সেটিকে শিল্পের মর্যাদা দিয়েছেন। কেউ কেউ আরো এক ধাপ এগিয়ে বিমূর্ত শিল্পকে অদক্ষ শিল্পীদের আত্মপ্রচারের কৌশল বলেও মনে করেন। কিন্তু একটি শিল্পকর্মকে শুধু—‘আমি এটা আঁকতে পারি কিনা?’—প্রশ্ন দিয়ে বিচার করলে, শিল্পের পরিসর অনেকটাই সংকুচিত হয়ে যায়। কারণ শিল্পের উদ্দেশ্য সবসময় নিখুঁত বাস্তবতার অনুকরণ নয়। একটি ছবি কতটা নিখুঁতভাবে মানুষের মুখ এঁকেছে, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তেমনি একটি ছবি মানুষের মনে কতটা তীব্র অনুভূতি তৈরি করতে পারছে, সেটিও শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। বিমূর্ত শিল্পের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এখানেই আসে শিল্পের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। একই ছবি একজন দর্শকের কাছে বিরক্তিকর মনে হতে পারে, অন্যজনের কাছে তা প্রশান্তির অনুভূতি তৈরি করতে পারে। কেউ বিভ্রান্ত হতে পারেন, কেউ আবার নিজের জীবনের কোনো স্মৃতি বা অভিজ্ঞতার সঙ্গে ছবিটির সম্পর্ক খুঁজে পেতে পারেন। তাই বিমূর্ত শিল্পের অর্থ অনেকাংশেই দর্শকের চোখে সম্পূর্ণ হয়।
শিল্পকে যদি শুধু ‘যা অন্যরা পারে না’ ধারণার ভিত্তিতে বিচার করা হয়, তাহলে শিল্পের সংজ্ঞা খুবই সংকীর্ণ হয়ে যায়। দৃশ্যশিল্প একটি বিস্তৃত শ্রেণী। এর মধ্যে বাস্তবধর্মী চিত্রকলা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিমূর্ততা, প্রতীকী প্রকাশ এবং নানা ধরনের পরীক্ষামূলক শিল্প।
সাহিত্যের ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যায়। একটি ক্ল্যাসিক উপন্যাস এবং একটি কল্পবিজ্ঞানধর্মী উপন্যাস দুটিই সাহিত্য। কিন্তু দুটির ভাষা, কাঠামো, বিষয় ও প্রকাশভঙ্গি এক নয়। সংগীতেও গানের কথা ছাড়াই শুধু সুর, তাল ও শব্দের মাধ্যমে আবেগ তৈরি করা সম্ভব। বিমূর্ত চিত্রকলাও অনেকটা সে জায়গা থেকেই কাজ করে, দৃশ্যমান কোনো গল্প না বলেও অনুভূতি তৈরি করা।
এর অর্থ এই নয় যে বিমূর্ত হলেই একটি ছবি ভালো শিল্প হয়ে যায়। যেকোনো শিল্পকর্মের মতো সেটিও সমালোচনার মুখোমুখি হতে পারে। প্রশ্ন হলো, সেটি কীভাবে নির্মিত হয়েছে, শিল্পীর উদ্দেশ্য কী ছিল এবং দর্শকের সঙ্গে সেটি কী ধরনের সম্পর্ক তৈরি করছে।
বিমূর্ত শিল্পকে বোঝার ক্ষেত্রে ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো শিল্পধারা শূন্য থেকে জন্ম নেয় না; তার পেছনে থাকে নির্দিষ্ট সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজম বা বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদ নতুন শক্তি নিয়ে সামনে আসে। যুদ্ধের ভয়াবহতা, মানবিক বিপর্যয় এবং আগের দশকের মহামন্দার অভিজ্ঞতা শিল্পীদের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। অনেক শিল্পী বাস্তব জগতের কোনো নির্দিষ্ট দৃশ্য আঁকার বদলে নিজেদের মানসিক অবস্থা, উদ্বেগ, যন্ত্রণা ও অস্তিত্বের প্রশ্নকে ক্যানভাসে প্রকাশ করতে শুরু করেন।
অর্থাৎ বিমূর্ত ছবি শুধু কিছু রঙের সমাহার নয়। অনেক সময় তা একটি নির্দিষ্ট সময়ের মানুষের মানসিক ইতিহাসও বহন করে। এ ধারার শিল্পীদের মধ্যে তিনজন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—ভাসিলি কান্দিনস্কি (১৮৬৬-১৯৪৪), জ্যাকসন পোলক (১৯১২-৫৬) ও মার্ক রথকো (১৯০৩-৭০)।
এর মধ্যে ভাসিলি কান্দিনস্কিকে বিমূর্ত শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উনিশ শতকের শেষ ভাগ ও বিশ শতকের শুরুর দিকে তিনি এমন এক শিল্পভাষা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন, যেখানে কোনো বাস্তব বস্তু বা দৃশ্যের অনুকরণ জরুরি নয়। তার কাছে রঙ ছিল কেবল সৌন্দর্যের উপাদান নয়; এর নিজস্ব মানসিক ও আধ্যাত্মিক শক্তিও রয়েছে। উজ্জ্বল রঙ, জ্যামিতিক আকৃতি ও গতিশীল রেখার মাধ্যমে তিনি এমন এক জগৎ তৈরি করেন, যার অর্থ বাস্তব জগতের কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর সঙ্গে সরাসরি মেলে না।
কান্দিনস্কির শিল্প-ভাবনার সঙ্গে সিনেস্থেশিয়া নামের একটি স্নায়ুবৈজ্ঞানিক অভিজ্ঞতার কথাও প্রায়ই আলোচিত হয়। এ ধরনের অভিজ্ঞতায় বিভিন্ন ইন্দ্রিয়র অনুভূতি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে পারে। যেমন শব্দের সঙ্গে রঙকে অনুভব করা। কান্দিনস্কির ক্ষেত্রে সংগীত ও রঙের সম্পর্ক তার শিল্প-ভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
আবার জ্যাকসন পোলকের শিল্পকর্ম দেখলে অনেকের প্রথম প্রতিক্রিয়া হতে পারে, ‘এতটুকুই?’ ক্যানভাসে ছড়িয়ে থাকা রঙ, রেখা ও দাগ যেন কোনো নির্দিষ্ট ছবির প্রতিনিধিত্ব করে না। কিন্তু পোলকের শিল্পে চূড়ান্ত ছবির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল এটি তৈরির প্রক্রিয়া। তিনি মেঝেতে বড় ক্যানভাস বিছিয়ে তার ওপর রঙ ঢালতেন, ছিটাতেন এবং বিভিন্নভাবে প্রবাহিত করতেন। এ পদ্ধতিই পরে তার ‘ড্রিপ টেকনিক’ ও ‘অ্যাকশন পেইন্টিং’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়। এখানে শিল্পী শুধু কী আঁকলেন তা গুরুত্বপূর্ণ নয়; কীভাবে আঁকলেন সেই শারীরিক গতি ও শক্তিও শিল্পের অংশ হয়ে যায়। ফলে পোলকের ক্যানভাসকে শুধু একটি স্থির ছবি হিসেবে দেখলে তার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। ছবির প্রতিটি রেখা যেন শিল্পীর শরীরের গতিবিধির চিহ্ন; একটি মুহূর্তের, একটি কর্মের, একটি ঘটনার রেকর্ড।
মার্ক রথকোর শিল্প আরো ভিন্ন। তার বিশাল ক্যানভাসে সাধারণত বড় বড় রঙের ক্ষেত্র দেখা যায়। কোনো মানুষের মুখ নেই, দৃশ্য নেই, নির্দিষ্ট বস্তু নেই। অথচ সে রঙের বিশাল পরিসর দর্শকের ওপর গভীর আবেগগত প্রভাব তৈরি করতে পারে। রথকোর শিল্প ‘কালার ফিল্ড পেইন্টিং’-এর সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত। তার ছবিতে রঙই যেন প্রধান চরিত্র। বড় ক্যানভাস ও সরল রঙের ক্ষেত্রের মাধ্যমে তিনি দর্শকের মধ্যে একধরনের গভীর, প্রায় অতীন্দ্রিয় অনুভূতি তৈরি করতে চেয়েছিলেন। দর্শক যখন ছবিটির সামনে দাঁড়ান, তখন সেটি কোনো গল্প বলে না; বরং ছবিটি দেখে নিজের অনুভূতির মুখোমুখি হন।
বিমূর্ত শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই, এর নির্দিষ্ট কোনো অর্থ নেই। দর্শককে নিজেই ভাবতে হয়। কৌতূহল জাগায়, প্রশ্ন তৈরি করে। শিল্পের বিতর্ক সম্ভবত সেখানেই।










