প্রাণ-প্রকৃতির ছায়ায় ঘেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই দেশের শিল্পানুরাগী, প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে আবেগের নাম। নতুন শিল্প এবং এর শিল্পীকে সবার কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সুযোগও বিশ্ববিদ্যালয় দেয় উদারভাবে।
প্রকৃতির নানা রূপের শোভায় সংস্কৃতির রাজধানী খ্যাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় মেতে ওঠে নানা আমেজে। শীত তার মধ্যে অন্যতম। শহর থেকে খানিক দূরে হওয়ায় প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে তাই সংস্কৃতিচর্চার এক ভিন্ন চিত্র বরাবরই বিদ্যমান দেশের এ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর এখন শীত মানেই জাহাঙ্গীরনগরে আয়োজিত হবে হিম উৎসব।
প্রকৃতির প্রতি আগ্রাসন কমিয়ে প্রকৃতি ও প্রাণে প্রাণ মেলানোর তাগিদে ‘ফিরে আসুক পাখির হাঁক, জল ও জীবন মুক্তি পাক’ স্লোগানকে ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজন হয়েছে ‘হিম উৎসব ১৪৩১’। ১৬, ১৭ ও ১৮ জানুয়ারি তিন দিনব্যাপী চলা এ উৎসবে পরিবেশন হয়েছে শাস্ত্রীয় সংগীত, কনসার্ট ও ভাবগানের আসর। পাশাপাশি ছিল দিনব্যাপী আর্ট ক্যাম্প: বিমূর্ত, ফটোগ্রাফি এক্সিবিশন, ভেটেরিনারি ক্লিনিক ক্যাম্প, হাট্টিমাটিম টিম (শৈশবের খেলা)।

ছবি: হাবিব আল হাদী
‘পরম্পরায় আমরা’ ওপেন প্লাটফর্ম থেকে আয়োজন করা হয় হিম উৎসবের। হিম উৎসব ১৪৩১ ছিল সপ্তম আসর। সম্পূর্ণ গণ-অর্থায়নে আয়োজিত এ উৎসবের জন্য প্রস্তুতি চলে দুই মাস কিংবা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে। অর্থ সংগ্রহের জন্যও আছে শিক্ষার্থীদের নান্দনিক ও বুদ্ধিদীপ্ত সব ভাবনা। নিজেদের ডিজাইন করা ব্যাজ, বুকমার্ক, ক্যালেন্ডার বানিয়ে সেগুলো নামমাত্র শুভেচ্ছা মূল্যে মানুষ সংগ্রহ করতে পারে এবং হয়ে উঠতে পারে হিম উৎসবের একজন অংশীদার।
পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শিল্প-সংস্কৃতিকে মনে লালন করে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ছোট অথচ জোরালো আওয়াজই হিম উৎসবের মূল। প্রচলিত বিভিন্ন শিল্পকলাকে এক উৎসবে নিয়ে আসা, একই মঞ্চ সবার জন্য উন্মুক্ত করার তীব্র প্রয়াস হিম উৎসবকে করেছে অনন্য।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে শতাধিক। তবু হিম উৎসব যেন সবকিছু থেকেই ভিন্ন। ভিন্ন মতাদর্শের, বিশ্বাসের মানুষ এক হয়ে যে উৎসবের আয়োজন করে তাতে তৃপ্তির ছাপ পরিপূর্ণ।
বরাবরই হিম উৎসব নতুন শিল্পীদের কাছে অন্যতম প্লাটফর্ম। হিম উৎসবের সপ্তম আসরে এবার আর্ট ক্যাম্প ছিল ভিন্নতায় ভরপুর। ১৬ জানুয়ারি সকালে শুরু হওয়া আর্ট ক্যাম্প ‘বিমূর্ত’ চলেছে দিনব্যাপী। অন্যান্যবার প্রতিষ্ঠিত শিল্পী ও শিক্ষার্থীদের আর্ট ক্যাম্পে আমন্ত্রণ করা হলেও এবার আর্টিস্ট হিসেবে ছিলেন শুধু শিক্ষার্থীরা।
তারুণ্যের উন্মাদনা, শক্তিকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস থেকেই এবারের ‘বিমূর্ত’ ধারার আর্টিস্টরা ছিলেন শিক্ষার্থী। এছাড়া আয়োজকদের বিশ্বাস নতুন নতুন শিল্পীকে সবার কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য সহায়ক হিসেবে কাজ করে হিম উৎসব।
উৎসবে আসা আর্টিস্ট কিশলয় রায় স্বচ্ছ জানান, ‘মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যে আর্টিস্টরা আমাদের দেশে কাজ করে গেছেন। তাদের কাজগুলোই এখনো মানুষ জানে। কিন্তু আমরা যারা নতুন আছি, যারা কাজ করছি কিংবা করার চেষ্টা করছি আমাদের চিন্তা, দর্শন তাদের থেকে ভিন্ন। এ ভিন্নতাকে ফুটিয়ে তোলার জন্য প্লাটফর্ম সংখ্যায় খুব কম আছে দেশে।’
বিভিন্ন জায়গার শিল্পীরা এসে ক্যাম্পাসের শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেন। তারা নিজেদের আর্ট, ভাবনা ও দর্শন বিনিময় করেন একে অন্যের সঙ্গে। আর প্রকৃতির নিবিড়তায় পারস্পরিক সহনশীলতার মধ্য দিয়ে এ শিল্পমাধ্যম আরো বেশি জাগ্রত হয়ে ওঠে। হিম উৎসবের প্রথম থেকে সপ্তম আসর প্রতিবারই আর্ট ক্যাম্প ছিল উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ।
এবারের আর্ট ক্যাম্পে অংশ নিয়েছেন ১৫ জন আর্টিস্ট। যারা নিজেদের ভাবনার বিস্তার ঘটিয়েছেন আর্ট ক্যাম্পে অংশ নিয়ে। আর্ট ক্যাম্পে আসা আরেকজন আর্টিস্ট মুন বলেন, ‘একটা ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছে হিম উৎসবে এসে। যেকোনো আয়োজনে একটা নির্দিষ্ট থিম দিয়ে রাখা হয় যা আসলে আর্টিস্টদের একটা গণ্ডিতে বেঁধে ফেলে। কিন্তু হিম উৎসবে তেমনটা ছিল না। আমি স্বাধীনভাবে এঁকেছি, যা আমি অনুভব করেছি সেটাই ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। এ রকম সাধারণত দেখা যায় না। এ রকম আয়োজন নিঃসন্দেহে আমরা যারা আর্টিস্ট আছি তাদের অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করবে। চাই এ রকম আয়োজন আরো হোক।’





