শিল্পী ফারজানা রহমান ববির চিত্রকর্মগুলো আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার গ্যালারিতে এসে যেন দর্শকের সঙ্গে কথোপকথন করছে। গত ৩০ অক্টোবর আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে তার দ্বিতীয় একক প্রদর্শনী ‘স্থিরতার অন্তঃস্বর (Sound Within Stillness)’-এর উদ্বোধন হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী মনিরুল ইসলাম। উপস্থিত ছিলেন শিল্পপ্রেমী নাহিদ মাহতাব, শিল্পী ও লেখক জাভেদ জালিল ও মুনতাসির মইন।

এ প্রদর্শনীতে ববির কাজ ধীর, সংযত পর্যবেক্ষণ ও আকারগত নিয়মানুবর্তিতার এক অনন্য সংমিশ্রণ তুলে ধরে। তার চিত্রগুলো প্রকৃতির নীরবতাকে ধীরে ধীরে পর্যবেক্ষণ করে উদ্ধার করে তার অদৃশ্য সুর, যা প্রিন্টমেকিং ও মিশ্র মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। দর্শককে এ চিত্রকর্মের মাধ্যমে তিনি আমন্ত্রণ জানান দেখতে, অনুভব করতে এবং নীরবতার সঙ্গে তাল মেলাতে।

7

প্রদর্শিত ৩৭টি চিত্রকর্ম সম্পর্কমুখী অধ্যয়নের নিদর্শন। পাতার গঠন, শেকড় ও শাখাগুলো এখানে উদ্ভিদবিদ্যার নকশা নয়, বরং সেগুলো অনূদিত হয়েছে মানবদেহের রক্তনালি ও স্নায়ুতন্ত্রের প্রতীকে, যা দর্শকের চোখে এক জীবন্ত সংযোগ সৃষ্টি করে। ববি তুলে ধরেছেন পৃথিবী ও উদ্ভিদজীবনের অদৃশ্য স্নায়ু ব্যবস্থা, যেখানে মাটির নিচে থাকা শেকড় আর ওপরের মানবজীবনের মাঝে গড়ে উঠেছে এক রহস্যময় সেতুবন্ধ। তার প্রতিটি কাজ যতটা নীরব, ততটাই অনুরণিত রঙের কম্পনে।

ববির সাম্প্রতিক শিল্পচর্চায় আকারগত এক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। তার আগের কাজগুলো যেখানে শেকড় ও স্নায়ুর অনুরূপ প্রবাহে গঠিত ছিল, নতুন ক্যানভাসে এসেছে এক শৃঙ্খলাবদ্ধ জ্যামিতি। ক্ষুদ্র ত্রিভুজ ও কোণাকৃতি সমতলগুলো ক্যানভাসকে সচেতনভাবে বিভক্ত করেছে। সেই খণ্ডগুলোর মধ্যে ক্ষুদ্র, স্পর্শযোগ্য আঁচড়, শিল্পীর ‘মাইক্রো বিটস অব মার্ক-মেকিং’ গড়ে তুলেছে এক মনোমুগ্ধকর, নৃত্যনির্ভর ছন্দ। এগুলো কোনো অলংকার নয়, বরং চিত্রের অভ্যন্তরীণ টাইমকিপার, যা লেখক জাভেদ জালিলের ভাষায় ‘মাইক্রো-রিঅ্যাকটিভ ভাইব্রেশন’ সৃষ্টি করে, যেখানে প্রতিটি কণিকা ‘ডিরেক্টেড ট্র্যান্স’-এর মতো এক ছন্দে আন্দোলিত হয়।

9

ববির কাজের হাইব্রিড স্বরূপ, প্রিন্টমেকিংয়ের শৃঙ্খলা ও চিত্রশৈলীর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ একসঙ্গে মিশে তৈরি করেছে সংযত অথচ প্রাণবন্ত উত্তেজনা। তিনি কলম, ব্রাশ ও ব্রাশ-পেনের সমন্বয়ে তৈরি করেছেন খসখসে, ব্রিস্টলি টেক্সচার, যা প্রযুক্তিগত নিখুঁত স্বাতন্ত্র্য ধরে রেখেও চিত্রশিল্পীর সংবেদনশীলতা হারায়নি।

তার বেশকিছু কাজেই প্রতিফলিত হয়েছে নৈতিক ও দার্শনিক অবস্থান। বৃদ্ধি ও ক্ষয়, আলো ও ছায়ার সূক্ষ্ম ভারসাম্য খুঁজে ফেরার মধ্য দিয়ে তিনি ধরতে চেয়েছেন এক গভীর পরিবেশগত অনুভূতি। নগরজীবনের ক্লান্ত একঘেয়েমি ও মানবিক ব্যাঘাত লুকিয়ে আছে ছবির নীরব স্তরগুলোয়। এ চিত্রগুলো দর্শককে কেবল দেখা নয়, অনুভবের আমন্ত্রণ জানায়। যেন ক্যানভাস নিশ্বাস নিচ্ছে, আর সেই নিশ্বাসে দর্শক ধীরে ধীরে আত্মমগ্ন হয়ে পড়ছে।

কিউরেটরিয়াল মন্তব্যে মাহফুজুর রহমান লিখেছেন, ‘ববির চিত্রগুলো বিমূর্ত হলেও বিচ্ছিন্ন নয়; এগুলো ভাঙন ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে নতুন দৃশ্যমান আকার উদ্ঘাটন করে। তার প্রতিটি পৃষ্ঠ যেন এক উন্মুক্ত অধ্যায়, যা বুঝতে প্রয়োজন ধৈর্য ও মনোযোগ। এ প্রদর্শনীর ছন্দ হলো সচেতনতা, দৃষ্টি খুলে দেখা এবং হৃদয় খুলে অনুভব করার আহ্বান।’

ফারজানা রহমান ববি ১৯৮৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রথম একক প্রদর্শনী ‘দ্য সোল অব দ্য সয়েল’ ২০১৯ সালে গ্যালারি শিল্পাঙ্গন, ঢাকায় আয়োজিত হয়। ২০২৫ সালে তার কাজ প্রদর্শিত হয়েছে ১১তম জিওজি ইন্টারন্যাশনাল আর্ট ফেস্টিভ্যাল, বুসান (দক্ষিণ কোরিয়া) ও বাংলাদেশ আর্ট উইক, দুবাইতে। ববি বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ও আর্ট ক্যাম্পের মাধ্যমে নিজের শিল্পচর্চা ধারাবাহিক রেখেছেন, যার মধ্যে রয়েছে এসপিবিএ ভুটান আর্ট ক্যাম্প ২০২৫ (বাংলাদেশ চ্যান্সারি কমপ্লেক্স, থিম্ফু), ২০১৯ সালের কসমস অ্যাটেলিয়ার ৭১-এ তোশিহিকো ইকেদার সঙ্গে এচিং ওয়ার্কশপ এবং লস্ট-ওয়াক্স প্রসেস ওয়ার্কশপ কির্স্টেন ফুগল এস্কাজারের সঙ্গে।

‘স্থিরতার অন্তঃস্বর’ প্রদর্শনীটি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সবচেয়ে গভীর পরিবর্তন প্রায়ই শুরু হয় সবচেয়ে কোমল ইঙ্গিত থেকে, একটি শেকড়, একটি রেখা, কিংবা একটি দীর্ঘ নিশ্বাস থেকে।