ইউরোপে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার যুগে রাজা ও ধনীরা শিল্পীদের সৃজনশীল কাজে সহযোগিতা করতেন ‘রেসিডেন্সি’ প্রদানের মাধ্যমে বা আশ্রয় দিয়ে। সেই হিসেবে শিল্প-সংস্কৃতিতে রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের ধারণা বেশ প্রাচীনই বলা চলে। জগদ্বিখ্যাত শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চিও রেনেসাঁ যুগে রাজা প্রথম ফ্রান্সিসের দরবারে কাজ করেছেন। মূলত এসব ঐতিহ্য থেকেই আধুনিক রেসিডেন্সির ধারণা গড়ে ওঠে।

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে শিল্পীদের সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য ইউরোপ ও আমেরিকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। পরে ষাট ও সত্তরের দশকে শিল্পী ও গবেষকদের জন্য গড়ে ওঠে আরো কিছু প্রতিষ্ঠান। বর্তমান বিশ্বে শিল্পের প্রসার এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়কে আরো সমৃদ্ধ করতে রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের মতো আয়োজন বেশ বড় ভূমিকা পালন করছে। রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম কেবল শিল্পীদের জন্য একটি স্থান বা আর্থিক সহায়তা নয়। এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সৃজনশীল বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্ম।

এ অঞ্চলে রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের প্রসঙ্গ এলে শান্তি নিকেতনের কথা সামনে আসে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আহ্বানে শিল্পী আসতেন জাপান থেকে। তারা শান্তি নিকেতনে বসবাস করতেন ও চিত্রকর্ম আঁকতেন। বর্তমান বাংলাদেশে স্বল্প পরিসরে গুটিকয়েক আয়োজক শিল্পীদের জন্য রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের আয়োজন করছে। তবে এসব আয়োজন যে মাত্রায় হওয়া উচিত তা যে হচ্ছে না, যেকোনো শিল্পীই তাতে একমত হবেন। তার পরও নানা সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ ডিঙিয়ে কাজ কেরে যাচ্ছেন কেউ কেউ।

8

তেমনই এক আয়োজনে এক দুপুরে দেখা হলো কয়েকজন শিল্পীর সঙ্গে। বয়সে তরুণ এ শিল্পীদের শিক্ষাজীবন শেষ হয়েছে কয়েক বছর আগেই। তারা সবাই এসেছেন দেশের নানা প্রান্ত থেকে। আরেকটু বিশেষায়িত করে যদি বলি, এদের প্রত্যেকেই নারী। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন কাজ নিয়ে, শিল্প নিয়ে। আবার পরক্ষণেই ছোট খোদাই যন্ত্র দিয়ে একমনে খোদাই করে যাচ্ছেন হাতে থাকা বোর্ডের ওপর। আর তাতেই ফুটে উঠছে বাহারি নকশা। সেই নকশা থেকেই কাগজের ওপর ছাপ দিয়ে তৈরি হবে ছাপচিত্র।

তবে কেবল নারীদের নিয়েই কেন এ আয়োজন? সে উত্তরটা অবশ্য পাওয়া গেল আলাপে আলাপেই। আয়োজকদের মধ্য থেকে কলাকাল স্টুডিওর সিলভিয়া নাজনীন জানালেন এ আয়োজনের আদ্যোপান্ত।

কালনী স্টুডিওর সঙ্গে যখন তিনি যৌথ উদ্যোগে রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের কথা ভাবছিলেন, তখনই তার মাথায় এসেছিল বাংলাদেশের নারী শিল্পীদের কথা। তাও আবার এমন শিল্পীদের কথা যারা সদ্য পড়াশোনা শেষ করেছেন। তাদের অনেকেই হয়তো জানেন না পড়াশোনার পরের ধাপের শিল্পচর্চার প্লাটফর্মের আগাগোড়া।

নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে সিলভিয়া বলছিলেন, ‘শহরকেন্দ্রিক নারীরা তুলনামূলক সুবিধাপ্রাপ্ত। তবু কতশত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন তাদের হতে হয়, সেখানে শহরের বাইরের নারীদের নিশ্চয়ই তার চেয়েও বেশি ভুগতে হচ্ছে—মূলত সেই ভাবনা থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নারীদের উন্মুক্ত আহ্বান করেছিলেন তারা। সাড়া দেয়া নারী শিল্পীদের মধ্য থেকে ছয়জনকে বাছাই করা হয়েছে এ আয়োজনে। তারা হলেন মাধবী রানী নাথ, সাদিকা করিম, জয়সংগিতা ধর, তানজিমা তাবাচ্ছুম এশা, মোহসানা আহসান সাবা ও কামরুন নাহার।

9

তানজিমা তাবাসসুম এশা বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায় পুরুষ শিল্পীরা কোনো না কোনোভাবে কাজ পেয়েই যান। নারীদের সে সুযোগটা সহজে হয়ে ওঠে না। সেই জায়গা থেকে এ রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম তার কাছে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

আরেক শিল্পী কামরুন নাহার জানালেন, এখানে প্রোগ্রাম শিডিউল অনুযায়ী প্রতিদিনই কথা বলার সুযোগ হচ্ছে দেশবরেণ্য শিল্পীদের সঙ্গে। তাদের কাজের অভিজ্ঞতা পথচলার অনুপ্রেরণা দিচ্ছে তাদের, যারা শিল্পকে ধ্যান-জ্ঞান করেই প্রতিষ্ঠিত হতে চাইছেন সমাজে।

10

চট্টগ্রাম থেকে আসা মাধবী রানী নাথও জানালেন তার অভিজ্ঞতার গল্প। মাধবী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতোকত্তর সম্পন্ন করেছেন। আইসিসিআর স্কলারশিপ নিয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও। তার পরও দেশে ঠিক কোথায়, কীভাবে কাজ শুরু করবেন তা বুঝে ওঠা কিছুটা কষ্টকরই। সেই জায়গা থেকে এ ধরনের আয়োজনে প্রতিদিন স্টুডিও ভিজিট, বরেণ্য শিল্পীদের সঙ্গে কর্মশালা তার কাজ করার প্রত্যয়কে আরো দৃঢ় করছে। সেই সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে উঠছে শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত অসংখ্য মানুষের সঙ্গে।

ডায়াস্পোরা ইউএসএর সৌজন্যে কালনী ও কলাকালের এ আয়োজন অনন্য ও অসাধারণ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবু কেন যেন মনে হচ্ছিল, মাত্র ছয়জন শিল্পীর পরিবর্তে যদি আরেকটু বড় পরিসরে হতো আয়োজনটা তাহলে বেশ হতো। তবে এ বিষয়েও নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা জানালেন আয়োজক সিলভিয়া নাজনীন । শোনালেন শিল্প ও শিল্পীর পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, স্টুডিওস্বল্পতা, তত্ত্বীয় ঘাটতি এবং চিন্তার সীমাবদ্ধতার কথা। সেই সঙ্গে জানালন সাধ ও সাধ্যের তারতম্যের কথা।

তিনি বলছিলেন, ‘এ ধরনের দিনব্যাপী আয়োজনের জন্য যে পরিমাণ আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের তা নেই।’

তবু কাজ করার ইচ্ছা, নতুনদের জন্য মসৃণ পথ তৈরির আকাঙ্ক্ষা থেকে স্বল্প পরিসরেই শুরু করেছেন তারা। যেহেতু নিজেদের নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সারা বছর ধরে তাই ছোট ছোট পরিসরেই নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে নেয়ার ইচ্ছা আছে তাদের। ইচ্ছা আছে ভবিষ্যতে প্রাচ্যকলা, অঙ্কন, চিত্রায়ণ প্রভৃতি বিষয়ের ওপর রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম আয়োজন করার।

এবারের আয়োজনে মূলত প্রিন্ট মেকিংকে কেন্দ্র করে করা একটি এক্সক্লুসিভ রেসিডেন্সি হিসেবে ১০ দিনের স্টুডিওর কাজগুলো বিন্যস্ত করা হয়েছে। রেসিডেন্সিতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা প্রিন্ট মেকিং, প্রযুক্তিগত বৃদ্ধি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সহযোগিতার সৃজনশীল সম্ভাবনার মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে আত্মোপলব্ধির সুযোগ পাবেন বলে আশা করছেন প্রোগ্রামের পরিচালক ও সঞ্চালকরা।

রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের সমাপ্তি ঘটেছে ৯ মার্চ। শেষদিন উপস্থিত ছিলেন প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী ও ফরিদা জামান। তারা মনে করেন, এ প্রোগ্রাম শিল্পীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্মে পরিণত হবে। এদিকে শিল্পীরাও প্রকাশ করেছেন উচ্ছ্বাস। রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের মধ্য দিয়ে তারা পেয়েছেন নতুন উদ্যম। বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতিচর্চা সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের ধারক হলেও শিল্পীদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধার অভাব এখনো রয়ে গেছে। এ ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের মতো আয়োজন। অথচ বাংলাদেশে শিল্পের জন্য সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা সীমিত। এখনো আমাদের শিল্পীরা দেশের বাইরে রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে অংশ নিতে যান। তবে বেশির ভাগেরই দেশের বাইরে গিয়ে রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে অংশ নেয়া সম্ভব নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকার ও এনজিওর সহযোগিতায় নতুন রেসিডেন্সি তৈরি করা, করপোরেট সংস্থাগুলোর আর্ট স্পন্সরশিপ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ফান্ডিং ও অনুদান সুবিধার প্রসার আমাদের আশার আলো দেখাবে—এটাই প্রত্যাশা।