ক্যানভাসে তুলি না ছুঁইয়ে ওপর থেকে রঙ ছড়িয়ে বা ঢেলে ছবি আঁকার অভিনব ‘ড্রিপ পেইন্টিং’ কৌশলের জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘নাম্বার ১৯, ১৯৫১’। ২ জুন বিশ্ববিখ্যাত নিলাম প্রতিষ্ঠান সদবি’জ গোপনে এক নিলামে এটি বিক্রি করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির ম্যানহাটনে অবস্থিত সদবি’জের সদর দপ্তরের দ্বিতীয় তলায়। সেদিন হঠাৎ করেই তলাটি সবার জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়। কড়া নিরাপত্তার কারণে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কর্মীরাও সেখানে ঢুকতে পারছিলেন না। সাধারণত এ তলাটিতে সদবি’জ তাদের সবচেয়ে বড় এবং কোটি কোটি ডলারের চিত্রকর্মের নিলামগুলোর আয়োজন করে। যেমন গত বছর এখানেই গুস্তাভ ক্লিমটের একটি চিত্রকর্ম ২৩ দশমিক ৬ কোটি ডলারে বিক্রি হয়ে ইতিহাস গড়েছিল। তাই স্বভাবতই সবার মনে কৌতূহল ছিল—কী এমন লুকিয়ে রাখা হয়েছে ভেতরে? অবশেষে জানা গেল, ভেতরে পোলকের এ ঐতিহাসিক পেইন্টিং বিক্রির গোপন যুদ্ধ চলছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক সমসvময়িক প্রভাবশালী শিল্পকলা গ্যালারি ‘পেস গ্যালারি’র প্রতিষ্ঠাতা আর্ন গ্লিমচারের ব্যক্তিগত সংগ্রহের এ বিশাল ছবিটি বিক্রির জন্য সদবি’জ এক সম্পূর্ণ গোপন বা ‘প্রাইভেট’ নিলামের আয়োজন করেছিল। প্রায় পাঁচ ফুট দৈর্ঘের তেলরঙের এ ক্যানভাসজুড়েই ছিল পোলকের চেনা শৈলীর কালো রঙের ঘন রেখার এক অদ্ভুত জাদুকরী রূপ। ছবিটির দাম ধরা হয়েছিল ৫ কোটি ডলার।

এ গোপন নিলাম সফল করতে সদবি’জ তাদের সবচেয়ে সেরা নিলামকারী অলিভার বার্কারকে লন্ডন থেকে স্পেশাল ফ্লাইটে নিউইয়র্কে উড়িয়ে আনেন। এমনকি কোটিপতি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে একটি বিশেষ ভিডিও তৈরি করা হয়েছিল। সদবি’জের উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে, নিঃশব্দে এ বিশাল লেনদেন সেরে ফেলা। করোনা মহামারীর পর থেকে আর্ট দুনিয়ায় এ ধরনের গোপন নিলামের চল বেশ বেড়েছে, যেখানে বড় বড় ধনী নিজেদের দামি শিল্পকর্ম প্রকাশ্য নিলামের আলো থেকে দূরে রেখে বিক্রি করতে পছন্দ করেন।

হিসাবের ভুল ও নিলাম বাতিল

সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল। মাত্র তিন সপ্তাহ আগেই আরেকটি নিলামঘরে পোলকের একটি ছবি প্রায় ১৮১ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়েছিল। তাই সদবি’জ ভেবেছিল পোলকের এ ছবির জন্যও সহজে ক্রেতা মিলবে। কিন্তু বাস্তবে হিসাব মেলেনি। আর্ট দুনিয়ার বিশেষজ্ঞদের মতে, ছবিটির জন্য ৫ কোটি ডলারের এ দাম ছিল অতিরিক্ত। এ দাম বাস্তবসম্মত ছিল না। ফলে এমন চড়া দামে ছবিটি কিনতে আগ্রহী এমন পর্যাপ্তসংখ্যক ক্রেতাকে সদবি’জ খুঁজেই পায়নি। শেষ পর্যন্ত কোনো দরদাতা না থাকায় পুরো আয়োজনটি বাতিল করতে হয়। অবশ্য ছবিটি কি আগের মালিকের কাছেই ফিরে গেছে, নাকি গোপনে অন্য কোথাও বিক্রি হয়েছে তা নিয়ে সদবি’জ কর্তৃপক্ষ এখনো মুখ খোলেনি।

আর্ট বাজারে মন্দার সংকেত

গোপন এ নিলামের ব্যর্থতা পুরো আর্ট বাজারের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনার ঠিক দুদিন পরই পেস গ্যালারির প্রধান নির্বাহী ঘোষণা করেন, তারা মন্দার কারণে তাদের কর্মী সংখ্যা ২০ শতাংশ কমিয়েছেন। একই সঙ্গে শিল্পীদের তালিকা এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনছেন। বছরের পর বছর ধরে যে বড় বড় মেগা গ্যালারির ওপর ভর করে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের আর্ট বাজার চলছিল, পোলকের ছবি বিক্রির এ ব্যর্থ চেষ্টা যেন প্রমাণ করল যে সেই জাঁকজমকপূর্ণ বাজারে এখন বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।

আর্টনিউজ অবলম্বনে নীরব হাসান